২৮৫ একর সম্পত্তি, তবু জরাজীর্ণ মসজিদ; আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১১:৪৭:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে

২৮৫ একর সম্পত্তি, তবু জরাজীর্ণ মসজিদ; আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে রয়েছে প্রায় ২৮৫ দশমিক ৭৮ একর সম্পত্তি। বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েও দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি। সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ, মামলা পরিচালনা ও উন্নয়নের নামে লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর দৃশ্যমান সুফল মসজিদের অবকাঠামোতে নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় মুসল্লিদের।
একই সঙ্গে মসজিদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ইজারা, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং বকেয়া খাজনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এমনকি মসজিদের বিপুল সম্পত্তি বেহাত বা আত্মসাতের আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের সম্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট জমির বিস্তারিত তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে। বিভিন্ন দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণসহ সম্পত্তির তালিকাও নথিতে সংযুক্ত আছে। ফলে মসজিদের নামে থাকা সম্পত্তির পরিমাণ নিয়ে স্থানীয়দের দাবির পাশাপাশি সরকারি নথিতেও এর ভিত্তি রয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, মসজিদের নামে থাকা বিপুল সম্পত্তি সঠিকভাবে পরিচালনা, সংরক্ষণ ও ইজারা দেওয়া হলে মসজিদের সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং মুসল্লিদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে মসজিদের অবস্থা দিন দিন নাজুক হচ্ছে। এতে সম্পত্তি থেকে পাওয়া অর্থ কোথায় যাচ্ছে, এ প্রশ্নও উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাজী ঢাকনা মুহাম্মদ সরকার কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে জমি দান করেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে সেই দান করা সম্পত্তিই মসজিদের অন্যতম বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে। তবে সম্পত্তির ভোগদখল, ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে বলে স্থানীয়রা জানান।
তাদের দাবি, ১৯৫৪ সালে কাদিরহাট এলাকার কিছু ওয়ারিশ নেকমরদ এলাকায় চলে যাওয়ার পর সম্পত্তির ভোগদখল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩২৭ নম্বর স্মারকে তদন্ত ও সম্পত্তির ভোগদখলসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি স্থানীয়দের।
তবে মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশনার পরও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ পুরোপুরি নিরসন হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। বরং একটি মহল মসজিদের সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে মসজিদের সম্পত্তি বেহাত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
মসজিদ পরিচালনা সংক্রান্ত ২০২৩ সালের ৩৯ নম্বর রেজুলেশন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, মসজিদের ২৩ শতাংশ জমি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আপ্যায়ন বাবদ প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া মামলা পরিচালনা, ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মসজিদের সম্পত্তি রক্ষার নামে যদি এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে, তাহলে মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কেন দৃশ্যমান নয়? এসব ব্যয়ের খাত, বিল-ভাউচার, অর্থের উৎস ও ব্যবহার প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, মসজিদের নামে বিপুল সম্পত্তি থাকার পরও সরকারের প্রায় অর্ধকোটি টাকা খাজনা বকেয়া রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে মসজিদের জমি থেকে প্রাপ্ত আয়, ইজারা এবং খাজনা পরিশোধের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মসজিদের জমি থেকে নিয়মিত আয় হলে এত বড় অঙ্কের খাজনা বকেয়া থাকার কথা নয়। তাই গত কয়েক বছরের জমির ইজারা, ইজারা মূল্য, আদায়কৃত অর্থ, খাজনা পরিশোধ এবং মসজিদের উন্নয়ন ও পরিচালনায় ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লি বলেন, মসজিদের নামে এত জমি থাকার পরও মসজিদের এমন জরাজীর্ণ অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। মসজিদের জমি ও আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তারা মসজিদের নামে থাকা ২৮৫ দশমিক ৭৮ একর জমির বর্তমান মালিকানা, দখল, ইজারা, খাজনা, জমি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মসজিদের সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথি ও সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনের আলোকে বিষয়টি তদন্ত এবং উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বিপুল সম্পদের মালিক একটি মসজিদ যদি বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে মসজিদের সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হচ্ছে?



















