১৫ বছর ধরে অসুস্থ জুঁই, থেমে গেছে স্কুলে যাওয়া; চিকিৎসার জন্য আকুতি
- আপডেট সময় : ০১:৪৭:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে

১৫ বছর ধরে অসুস্থ জুঁই, থেমে গেছে স্কুলে যাওয়া; চিকিৎসার জন্য আকুতি
বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধিঃ
বয়স মাত্র ১৫ বছর। যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে ছুটে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলায় মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই হাসপাতাল আর ওষুধের সঙ্গে জুঁই খাতুনের সখ্য প্রায় ১৫ বছরের। মাত্র সাত মাস বয়সে জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই অসুস্থতা যেন তার নিত্যসঙ্গী।
একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব যেভাবে হাসি-খেলায় কাটার কথা, জুঁইয়ের জীবন সেভাবে কাটেনি। দীর্ঘ চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছে সে। এখন অসুস্থতার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও বসতে পারেনি। অর্থের অভাবে প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে তার চিকিৎসাও।
জুঁই নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের দিনমজুর জুব্বার আলী ও রিনা বেগম দম্পতির মেজ মেয়ে। সে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
জুঁইয়ের শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে। পেট ফুলে থাকে, প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দেয়। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিও হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।
কথা বলতে গেলেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে জুঁইয়ের। অসুস্থ শরীর নিয়েও তার চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। সে আবার স্কুলে যেতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায়, বেড়াতে যেতে চায়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা আর পরিবারের আর্থিক সংকট যেন তার সেই স্বপ্নগুলোকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে।
জুঁই বলে, তার পেট ফুলে গেছে, পেট ও শরীরের পাশে ব্যথা করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সুস্থ হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে এবং স্কুলে যেতে চায় সে। সুস্থ হওয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছে কিশোরীটি।
মা রিনা বেগমের কাছে মেয়ের অসুস্থতার স্মৃতি যেন ১৫ বছরের পুরোনো এক দুঃস্বপ্ন। তিনি বলেন, জুঁইয়ের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন থেকেই তার অসুস্থতা শুরু। পেট ও চোখ-মুখ ফুলে যেত, তীব্র ব্যথা হতো এবং প্রস্রাবে বারবার সংক্রমণ দেখা দিত। চিকিৎসকেরা মেয়ের মূত্রনালিতে জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উল্লেখ করে রিনা বেগম বলেন, অর্থাভাবে প্রায় তিন মাস ধরে জুঁইয়ের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে জুঁইয়ের পেট আরও ফুলে যায়। তখন সে বসতে পারে না, শুতে পারে না, এমনকি ঘুমাতেও পারে না। দীর্ঘদিন মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের যা কিছু ছিল, তার অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো অর্থও তাদের হাতে নেই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিনা বেগম বলেন, “আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করছে। আমি চাই, মানুষ আমার মেয়ের পাশে দাঁড়াক। ও যেন আবার সুস্থ হয়ে স্কুলে যেতে পারে।”
জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার জন্য নিজের সামান্য সম্পদও বিক্রি করেছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন মেয়েকে। কিন্তু দীর্ঘদিনের চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব তিনি।
জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটিকে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে দেখছেন তারা। চিকিৎসা করাতে করাতে পরিবারের প্রায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, জুঁই এখন খুব কষ্টে আছে। পেট, চোখ-মুখ ফুলে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। পরিবারের আর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
জুঁইয়ের চাচী লিপি খাতুন বলেন, ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমরা আত্মীয়স্বজন মিলে যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি। এখন আর পারছি না।
চাচা শামিম বলেন, জুঁইয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের জমিজমা, গাছগাছালিসহ যা কিছু ছিল, তার অনেকটাই বিক্রি করা হয়েছে। এখন আর তাদের সামর্থ্য নেই। তাই মানুষের সহযোগিতাই তাদের শেষ ভরসা।
বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী বলেন, জুঁই তাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি। তিনি বলেন, আমরা চাই জুঁই দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসুক। সহৃদয় মানুষ তার চিকিৎসার জন্য এগিয়ে এলে মেয়েটির জীবনটা নতুন করে স্বাভাবিক হতে পারে।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, জুঁইয়ের পরিবার অত্যন্ত অসচ্ছল। দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটি অসুস্থ। তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে জুঁইয়ের চিকিৎসায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক বলেন, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি পরিচিত রোগ। রোগটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং বায়োপসির মাধ্যমে এর ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তিনি বলেন, রোগের ধরন তুলনামূলক কম জটিল হলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জটিল ধরন হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
জুঁই যেন আবার বই-খাতা হাতে স্কুলে যেতে পারে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে-এই স্বপ্নই এখন তার পরিবার ও স্বজনদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা এবং আর্থিক সহায়তা।
জুঁইয়ের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
বিকাশ নম্বর: ০১৭৭১-৭৪৫৬০১



















