প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধে আর বিলম্ব নয়, নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি
- আপডেট সময় : ০৫:০৬:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ ১২৩ বার পড়া হয়েছে

প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধে আর বিলম্ব নয়, নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি
এম এম মামুন:
বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক অবিলম্বে নিষিদ্ধ করে নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন কৃষক-কৃষাণী, গবেষক, মৎস্যজীবী, যুব সংগঠক ও পরিবেশকর্মীরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজশাহীর পবা উপজেলার কর্ণহার বিল এলাকায় উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও গ্রীণ কোয়ালিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে কৃষক-কৃষাণী, মৎস্যজীবী, কৃষিবিদ, গবেষক, যুব প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০টি দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যারাকুয়েট বাংলাদেশে এখনও অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় মাছ, মৌমাছি, পরাগায়নকারী পতঙ্গ, মাটির অণুজীব এবং জলজ ও স্থলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তারা আরও বলেন, এর ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের স্বাস্থ্য এবং দেশের খাদ্যব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। প্যান এশিয়া প্যাসিফিকের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশসহ চারটি এশীয় দেশে ব্যবহৃত ৯৬টি কীটনাশকের মধ্যে ৫৩টিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) দীর্ঘদিন ধরে এসব কীটনাশক পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার এবং নিরাপদ বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করে আসছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ রটারডাম কনভেনশন ও স্টকহোম কনভেনশনের সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বহন করে। তাদের মতে, প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধ করা কৃষির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশের পক্ষে একটি বৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
মানববন্ধনে কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম), জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা এবং এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষি চর্চায় সরকারি বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ সময় অংশগ্রহণকারী কৃষক, মৎস্যজীবী ও গবেষকরা বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্যব্যবস্থা, পরাগায়নকারী প্রাণী এবং কৃষি-প্রতিবেশব্যবস্থা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মানববন্ধন থেকে প্যারাকুয়েটসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সব অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা, নিবন্ধিত কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার জাতীয় কর্মসূচি জোরদার, কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তিতে ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ, মৌমাছি ও পরাগায়নকারী প্রাণী সংরক্ষণ, জাতীয় বিষক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং জাতীয় এগ্রোইকোলজি রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, “প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধের দাবি কোনো একক সংগঠনের নয়; এটি দেশের মানুষের জীবন, নিরাপদ খাদ্যের অধিকার, কৃষকের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জাতীয় দাবি।” তারা সরকারের প্রতি দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিরাপদ বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং এগ্রোইকোলজিকে জাতীয় কৃষি উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান।




















