ঢাকা ০৬:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে উত্তাল রাজশাহী, রেল যোগাযোগ বন্ধ ঝিনাইগাতীর লুবনা গ্রীণ ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার পঞ্চগড়ে ৩৩ বেকার যুবককে বিজিবির বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং প্রশিক্ষণ আটোয়ারী সেটেলমেন্ট অফিসে দালালের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ, হয়রানির শিকার জমির মালিকরা সংস্কারের অভাবে বেহাল রুহিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ঝুঁকিতে কালভার্ট শেরপুর জেলা যুবদলের সভাপতি আতা, সম্পাদক শওকত ঝিনাইগাতীতে নিহত নারায়ন কোচের পরিবারকে দুধাল গাভী উপহার ভেড়ামারায় অপহরণের পর ধ/র্ষ/ণের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তরুণীর মৃ/ত্যু মোহনপুরে মাদকবিরোধী সচেতনতা সমাবেশ, র‌্যালি ও লিফলেট বিতরণ রাজশাহীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্লাড কেয়ার ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী কর্মসূচি

“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও না”—গোদাগাড়ীতে সরিষা ফুলে ব্যস্ত মধু সংগ্রহ

মুক্তার হোসেন, গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:৪৮:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬ ২৯৬ বার পড়া হয়েছে

collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও না”—গোদাগাড়ীতে সরিষা ফুলে ব্যস্ত মধু সংগ্রহ

হলুদ সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জনে বাড়ছে ফলন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মধু আহরণে লাভবান মৌ চাষীরা

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কবিতার সেই পঙ্‌ক্তি—
“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও নাচি নাচি দাড়াও না একবার ভাই,
ওই ফুল ফোঁটে বনে যাই মধু আহরণে দাঁড়া বার সময় তো নাই”—
এ যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর, কমলাপুর, চর আষাড়িয়াদহ চর অঞ্চল ও বিভিন্ন খাল-বিলে এখন চোখ জুড়ানো হলুদ সরিষার ফুলে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ মাঠ। বরেন্দ্র অঞ্চলের দিগন্তজুড়ে সরিষার আবাদে মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ। সেই ফুলে ফুলে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির আনাগোনায় ফিরে আসে শৈশবের ছড়ার স্মৃতি।

মধু আহরণে এখন মৌমাছিদের যেন একটুও অবসর নেই। ভোঁ ভোঁ শব্দে দলে দলে তারা উড়ে যাচ্ছে দূর দূরান্ত থেকে। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসছে নিজ নিজ মৌচাকে। তবে এসব কোনো প্রাকৃতিক মৌচাক নয়—বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাক্সবন্দী মৌচাকে মধু জমা করছে মৌমাছিরা। সেখান থেকেই সংগ্রহ করা হচ্ছে মানসম্মত খাঁটি মধু।

কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির বিচরণে পরাগায়ন বৃদ্ধি পায়, ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরিষার ফলন বাড়ে। এজন্য সরিষা ক্ষেতে মধুর খামার গড়ে তুলতে মৌ খামারিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই দৃশ্য স্থানীয় কৃষকদেরও মৌ চাষে আগ্রহী করে তুলছে।

রাজশাহী–চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে বাসুদেবপুর বিল চড়াই এলাকায় সরিষার ক্ষেতে বসানো হয়েছে অসংখ্য মৌ বাক্স। গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর নামাজ গ্রামের আতাউর রহমান ২০০০ সাল থেকে সরিষার ক্ষেতে মধু চাষ করে আসছেন। শুরুতে ১০টি বাক্স দিয়ে কাজ শুরু করলেও লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই বাক্সের সংখ্যা বাড়িয়েছেন তিনি।

আতাউর রহমান জানান, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতিটি বাক্সে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মৌমাছি থাকে এবং একটি মাত্র রানী মৌমাছি ডিম পাড়ে। বাক্সের ভেতরে ৫ থেকে ১০টি মোমের ফ্রেম থাকে, যেখানে মধু জমা হয়। দিনে প্রায় ছয়বার করে কর্মী মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে ওই চাকগুলো ভরিয়ে তোলে।

তিনি আরও জানান, এখানে ‘এপিস মিলিফেরা’ জাতের মৌমাছি চাষ করা হচ্ছে। এরা সাধারণত দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূর থেকেও মধু সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি ৮–১০ দিন পরপর প্রতিটি বাক্স থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত সুস্বাদু মধু সংগ্রহ করা হয়, যা মাঠেই কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সরিষার মৌসুম শেষ হলে মার্চ মাসে লিচুর মুকুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য এসব বাক্স নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর কিংবা ঈশ্বরদী অঞ্চলে পাঠানো হবে। মৌ চাষীরা জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কার্যকর নজরদারি বাড়লে এই খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে।

বালিয়াঘাটা গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “মৌ চাষের এই দৃশ্য আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যতে আমরাও এই পদ্ধতিতে মধু আহরণে উদ্যোগ নেব।”

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ বলেন, “আমরা তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি পালনকে উৎসাহিত করছি—মধু উৎপাদন, সরিষার ফলন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কৃষকদের মৌ চাষে উদ্বুদ্ধ করা।”
তিনি জানান, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় এক হাজার মৌ বাক্স থেকে প্রায় ৯ হাজার কেজি মধু সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে। মৌমাছির উপস্থিতিতে সরিষার ফলন ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। পাশাপাশি মৌমাছি ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করেও ফসল উৎপাদনে সহায়তা করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও না”—গোদাগাড়ীতে সরিষা ফুলে ব্যস্ত মধু সংগ্রহ

আপডেট সময় : ০১:৪৮:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও না”—গোদাগাড়ীতে সরিষা ফুলে ব্যস্ত মধু সংগ্রহ

হলুদ সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জনে বাড়ছে ফলন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মধু আহরণে লাভবান মৌ চাষীরা

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কবিতার সেই পঙ্‌ক্তি—
“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও নাচি নাচি দাড়াও না একবার ভাই,
ওই ফুল ফোঁটে বনে যাই মধু আহরণে দাঁড়া বার সময় তো নাই”—
এ যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর, কমলাপুর, চর আষাড়িয়াদহ চর অঞ্চল ও বিভিন্ন খাল-বিলে এখন চোখ জুড়ানো হলুদ সরিষার ফুলে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ মাঠ। বরেন্দ্র অঞ্চলের দিগন্তজুড়ে সরিষার আবাদে মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ। সেই ফুলে ফুলে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির আনাগোনায় ফিরে আসে শৈশবের ছড়ার স্মৃতি।

মধু আহরণে এখন মৌমাছিদের যেন একটুও অবসর নেই। ভোঁ ভোঁ শব্দে দলে দলে তারা উড়ে যাচ্ছে দূর দূরান্ত থেকে। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসছে নিজ নিজ মৌচাকে। তবে এসব কোনো প্রাকৃতিক মৌচাক নয়—বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাক্সবন্দী মৌচাকে মধু জমা করছে মৌমাছিরা। সেখান থেকেই সংগ্রহ করা হচ্ছে মানসম্মত খাঁটি মধু।

কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির বিচরণে পরাগায়ন বৃদ্ধি পায়, ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরিষার ফলন বাড়ে। এজন্য সরিষা ক্ষেতে মধুর খামার গড়ে তুলতে মৌ খামারিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই দৃশ্য স্থানীয় কৃষকদেরও মৌ চাষে আগ্রহী করে তুলছে।

রাজশাহী–চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে বাসুদেবপুর বিল চড়াই এলাকায় সরিষার ক্ষেতে বসানো হয়েছে অসংখ্য মৌ বাক্স। গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর নামাজ গ্রামের আতাউর রহমান ২০০০ সাল থেকে সরিষার ক্ষেতে মধু চাষ করে আসছেন। শুরুতে ১০টি বাক্স দিয়ে কাজ শুরু করলেও লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই বাক্সের সংখ্যা বাড়িয়েছেন তিনি।

আতাউর রহমান জানান, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতিটি বাক্সে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মৌমাছি থাকে এবং একটি মাত্র রানী মৌমাছি ডিম পাড়ে। বাক্সের ভেতরে ৫ থেকে ১০টি মোমের ফ্রেম থাকে, যেখানে মধু জমা হয়। দিনে প্রায় ছয়বার করে কর্মী মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে ওই চাকগুলো ভরিয়ে তোলে।

তিনি আরও জানান, এখানে ‘এপিস মিলিফেরা’ জাতের মৌমাছি চাষ করা হচ্ছে। এরা সাধারণত দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূর থেকেও মধু সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি ৮–১০ দিন পরপর প্রতিটি বাক্স থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত সুস্বাদু মধু সংগ্রহ করা হয়, যা মাঠেই কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সরিষার মৌসুম শেষ হলে মার্চ মাসে লিচুর মুকুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য এসব বাক্স নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর কিংবা ঈশ্বরদী অঞ্চলে পাঠানো হবে। মৌ চাষীরা জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কার্যকর নজরদারি বাড়লে এই খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে।

বালিয়াঘাটা গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “মৌ চাষের এই দৃশ্য আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যতে আমরাও এই পদ্ধতিতে মধু আহরণে উদ্যোগ নেব।”

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ বলেন, “আমরা তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি পালনকে উৎসাহিত করছি—মধু উৎপাদন, সরিষার ফলন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কৃষকদের মৌ চাষে উদ্বুদ্ধ করা।”
তিনি জানান, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় এক হাজার মৌ বাক্স থেকে প্রায় ৯ হাজার কেজি মধু সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে। মৌমাছির উপস্থিতিতে সরিষার ফলন ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। পাশাপাশি মৌমাছি ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করেও ফসল উৎপাদনে সহায়তা করছে।