চাঁদার টাকা না পেয়ে স্কুল দপ্তরীকে ধ/র্ষ/ণ মামলায় ফাঁ/সানোর অভিযোগ, ইউপি সদস্যসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
- আপডেট সময় : ০৯:৫১:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬ ১১২ বার পড়া হয়েছে

চাঁদার টাকা না পেয়ে স্কুল দপ্তরীকে ধ/র্ষ/ণ মামলায় ফাঁ/সানোর অভিযোগ, ইউপি সদস্যসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
ঠাকুরগাঁওয়ে সালিশের নামে ৫ লাখ টাকার ফাঁকা চেক, ৩০ হাজার টাকা ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ; পাল্টা ধর্ষণ মামলা, তদন্তে পুলিশ
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভুল্লী থানার বালিয়া ইউনিয়নের কিসামত শুখানপুখুরী ময়না পাড়া গ্রামে চাঁদার পুরো টাকা না পেয়ে এক স্কুল দপ্তরীকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পঞ্চানন বর্মণ (৩৫) ওই এলাকার কৃষ্ট নারায়ণ বর্মণের ছেলে এবং পেশায় একজন স্কুল দপ্তরী। গত ৪ মার্চ তিনি ঠাকুরগাঁও সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন— ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মলিন্দ্র নাথ, বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলমগীর হোসেন গয়া, গ্রাম পুলিশ পরেশ চন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ, মুক্তি রানী, তার ছেলে রতন চন্দ্র ও স্ত্রী রিনা রানী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলুর ক্ষেতে কাজের জন্য রিনা রানীকে ডাকতে যান পঞ্চানন। রিনা পরে আসবেন বলে জানান। পাশেই কাজ করছিলেন তার নানী ধলেশ্বর বালা। পরে পঞ্চানন সেখান থেকে চলে যান।
অভিযোগ রয়েছে, ওইদিন সন্ধ্যার পর রিনার স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে পঞ্চানন রিনা রানীকে ধর্ষণ করেছেন। এরপর বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সালিশ বসান।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সালিশে রিনার পক্ষ নিয়ে পঞ্চাননের কাছে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। তিনি ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করলে তাকে লাঠিসোটা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে আপসের নামে উভয় পক্ষের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং ৫ লাখ টাকার ফাঁকা চেক ও ৩০ হাজার টাকা নগদ নেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, এই টাকা রিনার পরিবারকে না দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। পরদিন আরও টাকা দাবি করা হলে পঞ্চানন তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাকে মামলা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর ৪ মার্চ পঞ্চানন চাঁদাবাজির মামলা করেন। পরে ১০ মার্চ রিনা রানীর পক্ষ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। আদালতের নির্দেশে ভুল্লী থানা ১৬ মার্চ তদন্ত শুরু করে এবং পরদিন পঞ্চাননকে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি ধর্ষণের ঘটনা সত্যি হয়ে থাকে, তবে রাতারাতি কেন সালিশ বসানো হলো? আর ৫ লাখ টাকার চেক কে নিল?
রিনা রানী তার মামলার এজাহারে দাবি করেছেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ঘরে একা থাকাকালে পঞ্চানন তাকে ধর্ষণ করেন। তিনি আরও দাবি করেন, ১৬ ফেব্রুয়ারি ভুল্লী থানায় অভিযোগ দিতে গেলে ওসি তা গ্রহণ করেননি এবং পরে আদালতে যেতে বলেন।
তবে পুলিশ বলছে, “রিনা রানী” নামে কেউ ভুল্লী থানায় এসে অভিযোগ করেননি।
রিনার নানী ধলেশ্বর বালা বলেন, “সেদিন পঞ্চানন আইছিল হামার বাড়িত। ডাকাডাকির পর চলে যায়। মুই ঘরের পিছনত কাজ কচ্ছুনু। কই, কিছু হইলে তো কহিবা পান্নু হে।”
পঞ্চাননের পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, রিনা রানীর পরিবার দিনমজুরের কাজ করে এবং পঞ্চানন কেবল তাকে কাজে ডাকতে গিয়েছিলেন। পরে পরিকল্পিতভাবে তাকে ধর্ষণ মামলায় জড়ানো হয়েছে।
যুবদলের অর্থ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সরকার বলেন, ঘটনাটি সন্দেহজনক। যদি সত্যিই ধর্ষণ হয়ে থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিক মেডিকেল পরীক্ষা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আবার ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ স্থানীয়ভাবে টাকার বিনিময়ে আপস করার প্রশ্নই আসে না। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন গয়া বলেন, “ঘটনায় একটি আপোষনামা আমি করে দিয়েছি। সবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। মেয়েটাকে কয়েক দিন পর ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে। আমাদের কাছে সব তথ্য আছে। আর যে টাকা নেওয়া হয়েছে, সব মেয়ের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, ফাঁকা চেক ও আপোষনামার কাগজ ডা. ফারুকের কাছে রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, “ধর্ষণ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় সালিশ বা আপসের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ উঠলে পুলিশ তদন্ত করবে, আদালত বিচার করবে—এটাই আইনগত প্রক্রিয়া।”
তিনি আরও বলেন, “ধর্ষণের ঘটনায় ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মেডিকেল পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসা পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।”
বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্রো চৌধুরী বলেন, “ঘটনার সাত দিন পর আমি বিষয়টি জানতে পারি। তখনই বলেছি, ধর্ষণ মামলার বিচার করার ক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদের নেই। এটি সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়।”
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, “ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ তদন্ত করছে। অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। ধর্ষণের মতো গুরুতর মামলায় কোনো ধরনের আপস বা সালিশ আইনসম্মত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যাচাই করেছি, রিনা রানী নামে কেউ ভুল্লী থানায় অভিযোগ করতে আসেননি। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















