ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড: দরিদ্র মানুষের ন্যায়ের নতুন ভরসাস্থল
- আপডেট সময় : ০৪:৪৭:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫৬ বার পড়া হয়েছে

ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড: দরিদ্র মানুষের ন্যায়ের নতুন ভরসাস্থল
অভিযোগের ৭৬ শতাংশ নিষ্পত্তি—মানবিক সহায়তা ও মধ্যস্থতায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের আস্থা
ন্যায়বিচার পাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে যতটা কঠিন ছিল, ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সেই পথকে সহজ করে তুলছে ধারাবাহিকভাবে। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সেবা এখন জেলার অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে ন্যায়ের নতুন ভরসাস্থল।
গত ২৮ বছরের পথচলায় লিগ্যাল এইড কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ) মো. মজনু মিয়ার দায়িত্ব গ্রহণের পর। অভিযোগ গ্রহণ থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এসেছে স্বচ্ছতা ও গতি। আগে যেখানে সচেতনতার অভাবে খুব কম মানুষ এ সেবার কথা জানতেন, এখন ইউনিয়ন থেকে জেলা শহর পর্যন্ত লিগ্যাল এইডকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সচেতনতার জোয়ার।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৫২২ জন মানুষ বিনামূল্যে বিচারিক সহায়তা পেয়েছেন। দায়ের হওয়া ৫৭৮ অভিযোগের মধ্যে ৪৪০টি নিষ্পত্তি হয়েছে মধ্যস্থতার মাধ্যমে। সরকারি খরচে মামলা হয়েছে ১১১টি।
মধ্যস্থতার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের হাতে পৌঁছানো হয়েছে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ। জমি-জায়গা সংক্রান্ত জটিলতায় পড়া কয়েকজন দীর্ঘদিন পর মাঠ পর্যায়ে এসে নিজেদের প্রাপ্য জমিও পেয়েছেন।
জেলার ৫টি উপজেলায় লিগ্যাল এইড কমিটি সক্রিয় রয়েছে এবং ৫৪টি ইউনিয়নেও কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দির পর্যন্ত সর্বত্র চলছে সচেতনতা কার্যক্রম।
বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মানুষ জানতে পারছেন—আইনের সহায়তা মানেই আর জটিলতা নয়, বরং সঠিক জায়গায় আবেদন করলেই দ্রুত সমাধান মিলছে।
সাম্প্রতিক এক সেমিনারে তুলে ধরা হয় একটি মানবিক ঘটনা—
৩৫ বছরের বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা এক দম্পতির দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝি ও পারিবারিক দ্বন্দ্বে সন্তানরা মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। লিগ্যাল এইডে অভিযোগ দেওয়ার পর মধ্যস্থতার মাধ্যমে মা আবার তার সন্তানদের ফিরে পান কোনো খরচ ছাড়াই।
জমি নিয়ে দীর্ঘ ঝামেলায় থাকা পারুল বেগম বলেন, “লিগ্যাল এইড অফিস সবাইকে ডেকে সঠিকভাবে বাটোয়ারা নির্ধারণ করল। মনে হয়েছে মাথার ওপর থেকে বড় বোঝাটা নেমে গেল।”
অন্য আরেক ব্যক্তি ইমদাদুল হক বলেন, “নিজেরা চেষ্টা করে সমাধান করতে পারিনি। লিগ্যাল এইড অফিস মাঠে নেমে হিসাব-নিকাশ করে সীমানা ঠিক করায় দুই পক্ষই এখন নিশ্চিন্ত।”
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, “সরকারি খরচে লিগ্যাল এইড সেবা দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় বিচার পৌঁছে দিচ্ছে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা সমাজে শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করছে।”
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. মজনু মিয়া বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য—অর্থের অভাবে যেন কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। আমরা সরকারি খরচে আইনজীবী নিযুক্ত করি এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করি। সরেজমিনে গিয়ে নথি যাচাই করে উভয় পক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করি।”
তিনি আরও বলেন, “এভাবে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা বাড়ছে, বিরোধ কমছে এবং দরিদ্র মানুষ তাদের অধিকার রক্ষা করতে পারছে।”




















