লোকসানের ধাক্কায় রাজশাহীতে বন্ধ হচ্ছে পোলট্রি খামার
- আপডেট সময় : ০৯:১৫:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ১৫৮ বার পড়া হয়েছে

লোকসানের ধাক্কায় রাজশাহীতে বন্ধ হচ্ছে পোলট্রি খামার
এক দশকে অর্ধেকের বেশি খামার বন্ধ; ঋণের বোঝায় জর্জরিত উদ্যোক্তারা, সংকটে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে রাজশাহীতে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পোলট্রি খামার। গত এক দশকে জেলার অর্ধেকেরও বেশি প্রান্তিক ও মাঝারি খামার কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। পুঁজি হারিয়ে অনেক উদ্যোক্তা ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে।
খামারিদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের তুলনায় ডিম ও মুরগির বাজারমূল্য কম। পাশাপাশি বাজারে সিন্ডিকেট এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র প্রভাব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। ফলে রাজশাহীর পোলট্রি শিল্পে নেমে এসেছে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা।
রাজশাহীর পবা উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের খামারি সোহেল রানা জানান, দীর্ঘদিন লোকসান গুনতে গুনতে শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ টাকা ক্ষতি মাথায় নিয়ে সম্প্রতি তার ব্রয়লার খামারটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার দাবি, একই গ্রামের অন্তত ৫০ জন খামারি গত দুই বছরে তাদের খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।
রাজশাহী পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, এক দশক আগে পবার মল্লিকপুর, পারিলা, কুখন্ডি, রনহাট, মোসলেমের মোড় ও আশরাফের মোড়সহ আশপাশের এলাকায় প্রায় তিন হাজার পোলট্রি খামার ছিল। বর্তমানে সেখানে টিকে আছে মাত্র ৩০০টি খামার। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খামার বন্ধ হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে এবং এ পরিস্থিতি পুরো জেলাজুড়েই বিদ্যমান।
খামারি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুরগির খাদ্য, ভ্যাকসিন, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিম ও মুরগির বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। ফলে উৎপাদন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পবার মোসলেমের মোড় ডিমের আড়ত সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে সাড়ে ৯ থেকে ১০ টাকা। অথচ অনেক সময় খামারিদের ৭ থেকে ১০ টাকায় ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি ডিমেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
রাজশাহী পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, পুঁজি হারিয়ে হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আজ নিঃস্ব। শত শত পরিবার ঋণের চাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছে।
প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ, বাজার সিন্ডিকেট ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। লোকসানের মুখে তারা বাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, আর সেই সুযোগে বাজার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে বর্তমানে ১ হাজার ২৮৬টি লেয়ার, ২ হাজার ২৮২টি ব্রয়লার এবং ৫ হাজার ৭৫৩টি সোনালি মুরগির খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে প্রায় সোয়া দুই লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং সাড়ে ৬০ কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হয়। উৎপাদন এখনো জেলার চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও প্রান্তিক খামারিদের অস্তিত্ব সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আতোয়ার রহমান বলেন, মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছেন। তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ভর্তুকি ও সহায়তা প্রয়োজন।



















