ঢাকা ০৪:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
লালপুরে ৩৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক, থানায় মামলা ঠাকুরগাঁওয়ে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন পঞ্চগড় হাসপাতালের বেডে শি/শুকে ধ/র্ষ/ণচেষ্টার অভিযোগ, চিকিৎসাধীন রোগীকে গ্রেপ্তার সিংড়ায় ৭ মাসের গর্ভবতী স্ত্রীকে কু’পিয়ে হ/ত্যার অভিযোগ, স্বামী আটক মান্দায় এতিমখানার উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে মতবিনিময় সভা সামান্য বৃষ্টিতেই ধস, গোদাগাড়ীর সরমংলা ইকো পার্কের ওয়াকওয়ে নিয়ে প্রশ্ন তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে রাজশাহী চিনিকল শ্রমিকরা, শুরু ফটক সভা বরেন্দ্রকে স্মার্ট কৃষি অঞ্চলে গড়তে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান বিএমডিএ চেয়ারম্যানের উত্তরাঞ্চলে প্রথমবার শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ শনাক্তে বিশেষ উদ্যোগ, রাজশাহীতে তিন দিন বিনামূল্যে স্ক্রিনিং বাগাতিপাড়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে এসএসএসের ১,২৫০টি গাছের চারা বিতরণ

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী

নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৭:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ ১৮৪ বার পড়া হয়েছে

collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী

মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ও সংগ্রামের ইতিহাস বুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি, নির্যাতনের ক্ষত আর দীর্ঘ জীবনের বেদনা বুকে নিয়েই চিরবিদায় নিলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার এই নারী মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি।

বুধবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামের প্রবাসী রাজুর মিল চাতালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে এ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে স্থানীয় শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৬ থেকে ১৭ বছর। চারদিকে আতঙ্ক, ধ্বংস আর প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের রক্ষার আশায় তাঁর বাবা বাধ্য হয়ে তাঁকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দেন।

এরপর দীর্ঘ সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। স্বাধীনতার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসেন। পরে জন্ম হয় তাঁর ছেলে সুধীর রায়ের। তবে স্বাধীনতার পরও তাঁর জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়নি। সমাজের একাংশ দীর্ঘদিন তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে অবহেলা ও কটূক্তির শিকার করেছে।

স্বজনরা জানান, শত প্রতিকূলতার মাঝেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে ছিলেন টেপরী রাণী। তাঁর ছেলে সুধীর রায় বর্তমানে ভ্যানচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

দীর্ঘদিন অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য, জীবনের শেষ সময়ে এ স্বীকৃতি তাঁকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিয়েছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রামের গভীরতা মনে করিয়ে দেয়।”

জীবদ্দশায় টেপরী রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা।

অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বিদায় নিলেও বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীর জীবনগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী

আপডেট সময় : ০৮:৫৭:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী

মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ও সংগ্রামের ইতিহাস বুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি, নির্যাতনের ক্ষত আর দীর্ঘ জীবনের বেদনা বুকে নিয়েই চিরবিদায় নিলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার এই নারী মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি।

বুধবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামের প্রবাসী রাজুর মিল চাতালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে এ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে স্থানীয় শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৬ থেকে ১৭ বছর। চারদিকে আতঙ্ক, ধ্বংস আর প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের রক্ষার আশায় তাঁর বাবা বাধ্য হয়ে তাঁকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দেন।

এরপর দীর্ঘ সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। স্বাধীনতার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসেন। পরে জন্ম হয় তাঁর ছেলে সুধীর রায়ের। তবে স্বাধীনতার পরও তাঁর জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়নি। সমাজের একাংশ দীর্ঘদিন তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে অবহেলা ও কটূক্তির শিকার করেছে।

স্বজনরা জানান, শত প্রতিকূলতার মাঝেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে ছিলেন টেপরী রাণী। তাঁর ছেলে সুধীর রায় বর্তমানে ভ্যানচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

দীর্ঘদিন অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য, জীবনের শেষ সময়ে এ স্বীকৃতি তাঁকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিয়েছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রামের গভীরতা মনে করিয়ে দেয়।”

জীবদ্দশায় টেপরী রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা।

অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বিদায় নিলেও বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীর জীবনগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।