রাণীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

রাণীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ
মনোরঞ্জন চন্দ্র, রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ, কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ও গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মালামাল গ্রহণের সময় চালানপত্র দেখাতে না পারা, ছুটির দিনে সরঞ্জাম স্টোরে রাখা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে সংশ্লিষ্ট স্টোরকিপার ও ঠিকাদারের দাবি, নিয়ম মেনেই সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে একটি ট্রাকে করে টেন্ডারের আওতায় কেনা কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। পরে সেগুলো হাসপাতালের স্টোররুমে রাখা হয়। এ সময় স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলামের কাছে সরবরাহের চালানপত্র দেখতে চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। চালানপত্র সঙ্গে না থাকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছাড়া মালামাল গ্রহণের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্টোরকিপারের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহের পরিমাণ কম দিতে পারে, অথচ কাগজপত্রে পুরো সরবরাহ দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ শহরের উকিলপাড়ার ঠিকাদার শফিকুল আলম রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ পেয়েছেন। টেন্ডারের মূল্য নিয়ে রয়েছে ভিন্ন বক্তব্য। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকার টেন্ডারের কথা বলা হলেও ঠিকাদার শফিকুল আলমের দাবি, টেন্ডারের প্রকৃত মূল্য ৪৫ লাখ টাকা।
স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলাম জানান, টেন্ডারের মোট মূল্য তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে টেন্ডারের প্রকৃত মূল্য, সরবরাহের তালিকা এবং এ পর্যন্ত কত টাকার সরঞ্জাম এসেছে, তা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ধরন, পরিমাণ, মডেল, ব্র্যান্ড ও মান যাচাই করে মালামাল গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কীভাবে সরঞ্জাম গ্রহণ করা হয়েছে, কোন নথি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত যাচাই কীভাবে হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতাল এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কয়েক ধাপে মালামাল সরবরাহের সুযোগ থাকলে সেটির নথি থাকা উচিত। তাঁদের প্রশ্ন, চালানপত্র ছাড়া মালামাল গ্রহণ করা হলে পরিমাণ ও মান যাচাই কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
তারা সরবরাহ করা সরঞ্জামের তালিকা, চালানপত্র, কার্যাদেশ এবং গ্রহণসংক্রান্ত নথি যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের দাবি জানান।
মালামাল গ্রহণের বিষয়ে স্টোরকিপার সাদেকুল ইসলাম বলেন, কত টাকার মাল, তা আমার জানা নেই। মালগুলো ১৯ তারিখে আসার কথা ছিল। আরও মালামাল আসবে। ঊর্ধ্বতনের অনুমতি সাপেক্ষে আমি মালগুলো স্টোরে জমা রেখেছি। সব মালামাল স্টোরে জমা হওয়ার পর তালিকা করে ঊর্ধ্বতন স্যারদের কাছে জমা দেব। পরে স্যারেরা টিম অনুযায়ী সেগুলো পরিদর্শন করবেন।
চালানপত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আমার কাছে নেই, বাসায় রেখে এসেছি।
তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়ে সাদেকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
ঠিকাদার শফিকুল আলম বলেন, কয়েক ধাপে মালামাল সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। সরকারি ক্রয়চুক্তির শর্তে অনুমতি থাকলে এভাবে সরবরাহ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ৬০ লাখ নয়, মোট ৪৫ লাখ টাকার টেন্ডার। কয়েক ধাপে সব মালামাল আসবে। এর আগে একবার কিছু মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কিছু মালামাল ঢাকা থেকে এসেছে। পূজার ছুটির পর বাকি মালামাল আসবে। এখানে কোনো লুকোচুরির কিছু নেই। নিয়ম অনুযায়ীই আমরা কাজ করছি।
রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েক ধাপে মালামাল সরবরাহ করতে পারবে। স্টোরকিপার মালামাল বুঝে নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা সেগুলো পরিদর্শন করে বুঝে নেবেন। প্রয়োজনে সরেজমিনে এসে মালামাল দেখে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে মালামাল গ্রহণের সময় কী কী নথি প্রস্তুত করা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে কতটুকু সরঞ্জাম গ্রহণ করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত যাচাইয়ের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, রাণীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার বা সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে তিনি অবগত নন। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ও গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, চালানপত্র, সরবরাহের তালিকা এবং গ্রহণসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।





















