গারো পাহাড়ে বনের জমি বেদখল, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
- আপডেট সময় : ০৮:০০:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬ ৪৬ বার পড়া হয়েছে

গারো পাহাড়ে বনের জমি বেদখল, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
শেরপুর সীমান্তজুড়ে বনভূমি দখল বাড়ছে, দেশীয় বৃক্ষ উজাড়ে সংকুচিত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল
শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় অঞ্চলে বনের জমি বেদখল রোধ ও উদ্ধার কার্যক্রমে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় শাল-গজারীসহ দেশীয় নানা প্রজাতির বৃক্ষে আচ্ছাদিত গারো পাহাড় ছিল পশুপাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। তবে বনভূমি উজাড় ও জমি দখলের কারণে এখন সেই পরিবেশ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগ জানায়, ১৯৯১ সালে গারো পাহাড় এলাকায় দেশীয় পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ নিধন করে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক বন (উডলট) বাগান গড়ে তোলা হয়। পরিবেশবিদদের অভিযোগ, এসব সামাজিক বন প্রকল্পের আড়ালেই বনভূমি দখলের প্রবণতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে শতশত একর বনভূমি বেদখল অবস্থায় থাকলেও তা উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেই।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে জমিদারি প্রথার সময় শেরপুর জেলার তিনটি উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ২১ হাজার একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই বনাঞ্চলে শাল-গজারীসহ দেশীয় বিভিন্ন বৃক্ষের আধিক্য ছিল এবং নানা প্রজাতির পশুপাখির বিচরণে এলাকা মুখর থাকত।
কালের পরিক্রমায় বনভূমি দখল, দেশীয় বৃক্ষ নিধন ও অবৈধ বসতি স্থাপনের কারণে গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দখলদাররা বনভূমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। বনের জমিতে গড়ে উঠেছে জনবসতি, রাবার বাগান, দোকানপাট, হাটবাজার, এমনকি খেলার মাঠও।
বনের বেদখলকৃত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্ধ্যাকুড়, গোমড়া, হলদীগ্রাম, গজারীকুড়া, গিলাগাছা, ভালুকা, গান্দিগাঁও ও বাকাকুড়াসহ বিভিন্ন এলাকা।
অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তার যোগসাজশে বছরের পর বছর এসব জমি দখল হয়েছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, ২১ হাজার একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার একর বর্তমানে দখলদারদের কবজায় রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত দখলকৃত জমির পরিমাণ আরও বেশি।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বেদখল জমির তালিকা প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হলেও উদ্ধার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় বন্য হাতির আবাসস্থলও হুমকির মুখে পড়েছে। জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে গারো পাহাড় এলাকায় বন্য হাতির তাণ্ডব বাড়তে থাকে। বর্তমানে হাতি ছাড়া অন্য বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়। খাদ্য ও আবাসস্থলের সংকটে হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসছে, ফলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়রা জানান, হাতির আক্রমণ থেকে ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষায় অনেকেই বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার করছেন। এতে হাতির মৃত্যু ঘটছে। আবার মশাল জ্বালিয়ে হাতি তাড়াতে গিয়ে অনেক মানুষও প্রাণ হারাচ্ছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, বনের জমি দখলমুক্ত করে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা গেলে বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হবে। এতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
আব্দুল করিম জানান, গত বছর প্রায় ৫০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে মো. সুমন মিয়া বলেন, গত এক বছরে প্রায় ১ একর বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুরো বেদখল জমি উদ্ধার করে দেশীয় বৃক্ষরোপণ করা গেলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে কাজি মো. নুরুল করিম বলেন, বনের বেদখলকৃত জমি উদ্ধারে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



















