তীব্র পানি সংকটে মরুকরণের ঝুঁকিতে বরেন্দ্র অঞ্চল, মানা হচ্ছে না সরকারি বিধিনিষেধ
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬ ৭১ বার পড়া হয়েছে

তীব্র পানি সংকটে মরুকরণের ঝুঁকিতে বরেন্দ্র অঞ্চল, মানা হচ্ছে না সরকারি বিধিনিষেধ
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে; সংকটাপন্ন ঘোষণা করেও বন্ধ হয়নি অবাধ পানি উত্তোলন
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এক সময় যেসব পুকুর ও নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করতেন মানুষ, সেসব উৎস এখন অনেক জায়গায় প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। খাওয়ার পানি থেকে শুরু করে কৃষিকাজ—সবখানেই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বরেন্দ্র অঞ্চল দ্রুত মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাটের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এসব এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি পানিসংকটে ভুগছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বরেন্দ্র অঞ্চলের পাঁচ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা ও প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানি সংকট এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ৬ নভেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সরকারি গেজেটে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে আগামী ১০ বছরের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘পানি আইন-২০১৩’ অনুযায়ী এসব এলাকায় সেচ কিংবা শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের পানি ব্যবহারও নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অনেকেই সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে ধানখেতে সেচ দিচ্ছেন। রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির ভেতর থেকে গোপনে পাইপ টেনে জমিতে পানি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “জমি ফেলে রাখলে খাব কী? তাই বাধ্য হয়েই পানি তুলতে হচ্ছে।”
গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলেও মাটির নিচে পানি জমা হচ্ছে না। ফলে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং অনাবাদি হয়ে পড়ছে জমি।
ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (ওয়ারপো) ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৮৫-৯০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ২০২৫ সালে তা নেমে গেছে ৮০ থেকে ৯০ ফুটে। কোনো কোনো এলাকায় ২০০ ফুট নিচেও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে পানির স্তর ছিল ৩৯ ফুট নিচে, যা ২০১৬ সালে নেমে যায় ১১৮ ফুটে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশের সবচেয়ে শুষ্ক ও উষ্ণ অঞ্চল এখন বরেন্দ্র। গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে দেশের তুলনায় এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত প্রায় ৪০ শতাংশ কম। গত কয়েক দশকে বৃষ্টিপাতও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ১৯৮৫-৮৬ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর কথা থাকলেও বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানাধীন হাজার হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, “বিএমডিএ মাত্র ২৭ শতাংশ পানি তোলে। বাকি পানি তুলছে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প। এগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”
তিনি জানান, ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ বাড়াতে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পদ্মার পানি ব্যবহার ও খাল-পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে সংকট নিরসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, “শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরেন্দ্র অঞ্চলে পদ্মার পানি পৌঁছাতে হবে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে এবং সরকারি জলাশয়গুলো সেচের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।



















