ঢাকা ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সিংড়ায় ট্রাক-অটোভ্যান সংঘর্ষে নারীর মৃত্যু, স্বামী আহত উপকূলজুড়ে রহস্যময় আলোর ঝলক, কক্সবাজার থেকে মনপুরা পর্যন্ত চাঞ্চল্য বিএনপির জন্য যারা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে দল: দুলু শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মনোবলই শক্তি-আশির উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম বিএডিসির বীজে একই খেতে তিন রকম ধান, বিপাকে রাজশাহীর কৃষক পুঠিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, পুড়ে ছাই ৩ টিনশেড বাড়িসহ ৭ ছাগল নাতির ছোড়া হাঁসুয়া দাদির পেটে বিদ্ধ, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু দুবাই থেকে হ/ত্যা মামলার আসামিকে দেশে আনলো পিবিআই বাগাতিপাড়ায় নাটোরের দুই মাদক ব্যবসায়ী ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হাসপাতালে গৃহবধূর মরদেহ রেখে পালালেন স্বজনরা

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মনোবলই শক্তি-আশির উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম

নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৯:১৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ৬৭ বার পড়া হয়েছে

Collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মনোবলই শক্তি-আশির উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম

প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ১৫ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদে অনলাইন সেবা দিচ্ছেন আশির উদ্দিন, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা

জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী আশির উদ্দিন। তবে তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলে সহজে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। তার দুই পা সম্পূর্ণ অকেজো। তবুও জীবনের প্রতি নেই কোনো অভিযোগ। দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল মানুষ হিসেবে।

চেহারা, গঠন কিংবা উপস্থিতি—কোনো দিক থেকেই তাকে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা মনে হয় না। বরং নিজের মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারলেও আশির উদ্দিন নিজের মতো করেই চলাফেরা করেন। প্রয়োজন হলে দুই হাত ও বিশেষ জুতার সাহায্যে চলেন। আগে দূরে কোথাও যেতে হলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোগাড়ি ব্যবহার করে অনেকটাই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন তিনি।

এক সময় জীবিকার তাগিদে পুরোনো তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ভ্যান ব্যবহার করতেন। বর্তমানে কম দামের একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। তবে সেটি প্রায়ই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্যের সহায়তা ছাড়া গাড়িটি সরানোও তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

সব প্রতিকূলতা জয় করে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা দিয়ে সহায়তা করছেন। এর বিপরীতে সরকারি কোনো নির্দিষ্ট বেতন বা ভাতা পান না। মানুষ সন্তুষ্ট হয়ে যে সম্মানী দেন, তা দিয়েই চলে তার সংসার।

নিজের উপার্জন দিয়েই স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ করছেন আশির উদ্দিন। সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি এখন এলাকার অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।

আশির উদ্দিন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ৩ নম্বর হোসেনগাঁও ইউনিয়নের কলিগাঁও গ্রামের মো. মাতিন ও সাজিরুন দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

তিনি জানান, হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মুন্সি আব্দুল জব্বার দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর পাশ্ববর্তী হরিপুর উপজেলার কাঠালডাঙ্গীর একটি কৃষি ডিপ্লোমা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কৃষি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনি করাতেন এবং পাশাপাশি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন। এরপর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

আশির উদ্দিন বলেন, “আমি ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী ছিলাম। নিজেকে এই জায়গায় আনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমার মতো অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত থাকলেও আমি সেই পথে না গিয়ে নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ সহায় থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করতে পারব।”

সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার জন্য যদি সরকারি কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে আরও ভালোভাবে চলতে পারব।”

হোসেনগাঁও ইউনিয়নে সেবা নিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা মো. লিটন, রফিকুল ইসলাম, লিমা আক্তার ও খাদেমুল ইসলামসহ অনেকেই তার প্রশংসা করে বলেন, আশির উদ্দিন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইউনিয়নের মানুষের বিভিন্ন অনলাইন সেবা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দিয়ে সহযোগিতা করছেন। তার ব্যবহার ও আন্তরিকতায় সবাই মুগ্ধ।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, “আশির উদ্দিন খুব ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। তিনি নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এছাড়া সমাজসেবা অফিস থেকে ঋণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। কয়েক বছর আগে তাকে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবেও পুরস্কৃত করা হয়েছে।”

হোসেনগাঁও ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আশির উদ্দিন মানুষের সেবা দিয়ে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সমাজের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মনোবলই শক্তি-আশির উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম

আপডেট সময় : ০৯:১৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মনোবলই শক্তি-আশির উদ্দিনের জীবনসংগ্রাম

প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ১৫ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদে অনলাইন সেবা দিচ্ছেন আশির উদ্দিন, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা

জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী আশির উদ্দিন। তবে তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলে সহজে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। তার দুই পা সম্পূর্ণ অকেজো। তবুও জীবনের প্রতি নেই কোনো অভিযোগ। দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল মানুষ হিসেবে।

চেহারা, গঠন কিংবা উপস্থিতি—কোনো দিক থেকেই তাকে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা মনে হয় না। বরং নিজের মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারলেও আশির উদ্দিন নিজের মতো করেই চলাফেরা করেন। প্রয়োজন হলে দুই হাত ও বিশেষ জুতার সাহায্যে চলেন। আগে দূরে কোথাও যেতে হলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোগাড়ি ব্যবহার করে অনেকটাই স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন তিনি।

এক সময় জীবিকার তাগিদে পুরোনো তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ভ্যান ব্যবহার করতেন। বর্তমানে কম দামের একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। তবে সেটি প্রায়ই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অন্যের সহায়তা ছাড়া গাড়িটি সরানোও তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

সব প্রতিকূলতা জয় করে প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সেবা দিয়ে সহায়তা করছেন। এর বিপরীতে সরকারি কোনো নির্দিষ্ট বেতন বা ভাতা পান না। মানুষ সন্তুষ্ট হয়ে যে সম্মানী দেন, তা দিয়েই চলে তার সংসার।

নিজের উপার্জন দিয়েই স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ করছেন আশির উদ্দিন। সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি এখন এলাকার অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম।

আশির উদ্দিন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ৩ নম্বর হোসেনগাঁও ইউনিয়নের কলিগাঁও গ্রামের মো. মাতিন ও সাজিরুন দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

তিনি জানান, হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মুন্সি আব্দুল জব্বার দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর পাশ্ববর্তী হরিপুর উপজেলার কাঠালডাঙ্গীর একটি কৃষি ডিপ্লোমা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কৃষি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনি করাতেন এবং পাশাপাশি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন। এরপর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

আশির উদ্দিন বলেন, “আমি ছোট থেকেই পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী ছিলাম। নিজেকে এই জায়গায় আনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমার মতো অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত থাকলেও আমি সেই পথে না গিয়ে নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ সহায় থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করতে পারব।”

সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার জন্য যদি সরকারি কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে আরও ভালোভাবে চলতে পারব।”

হোসেনগাঁও ইউনিয়নে সেবা নিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা মো. লিটন, রফিকুল ইসলাম, লিমা আক্তার ও খাদেমুল ইসলামসহ অনেকেই তার প্রশংসা করে বলেন, আশির উদ্দিন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও সমাজের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ইউনিয়নের মানুষের বিভিন্ন অনলাইন সেবা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে দিয়ে সহযোগিতা করছেন। তার ব্যবহার ও আন্তরিকতায় সবাই মুগ্ধ।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, “আশির উদ্দিন খুব ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। তিনি নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এছাড়া সমাজসেবা অফিস থেকে ঋণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। কয়েক বছর আগে তাকে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবেও পুরস্কৃত করা হয়েছে।”

হোসেনগাঁও ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আশির উদ্দিন মানুষের সেবা দিয়ে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সমাজের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ।”