যাদের খবর কেউ রাখে না-বালিতেই যাদের জীবন-সংসার, কষ্ট আছে, দুঃখ নেই
- আপডেট সময় : ১০:১৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ১০১ বার পড়া হয়েছে

যাদের খবর কেউ রাখে না-বালিতেই যাদের জীবন-সংসার, কষ্ট আছে, দুঃখ নেই
মোঃ কামরুল ইসলাম কামু, বিশেষ প্রতিনিধি, পঞ্চগড়ঃ
সকাল হলেই জীবন-সংগ্রামে নেমে পড়েন তারা। নদীর বুকে কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে বালি তোলাই যাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। রোদ-বৃষ্টি, শীত কিংবা প্রবল স্রোত-কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারে না। কারণ সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় পরিবারের জন্য চাল-ডাল, লবণ-তেল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে নিতে হয়। তাদের খবর হয়তো কেউ রাখে না, কিন্তু তাদের শ্রমেই চলে অসংখ্য পরিবারের সংসার।
করতোয়া নদীবিধৌত পঞ্চগড়ে বালি ও নুড়ি পাথর দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও বালুমহালে শত শত, কোথাও কোথাও হাজারো শ্রমিক বালি উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে যৌবনের শুরুতেই অনেক মানুষ নেমে পড়েন নদীতে। পানির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে বালি তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। নদীতে পানি থাকুক কিংবা না থাকুক-বালি তোলা যেন তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন বালুমহালে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আট ঘণ্টা নদীতে কাজ করে একজন শ্রমিক গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। দেবীগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর এলাকার বালি শ্রমিক নেপাল রায় জানান, প্রায় আট ঘণ্টা পানিতে ডুবে বালি তুলে তিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পান। একই এলাকার সালমানও প্রায় একই আয়ের কথা জানান।
দেবীগঞ্জের সোনাপোতা এলাকার ট্রাকচালক মমতাজুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে বালি পরিবহনের কাজ করছেন। প্রতিদিন তাঁর আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। শুষ্ক মৌসুমে আয় কিছুটা বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়।
নদী থেকে এক ট্রাক্টর বালি তুলে ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দিলে শ্রমিকদের দেওয়া হয় প্রায় ৩৫০ টাকা। এভাবেই শ্রমিকদের ঘাম ও পরিশ্রমে একের পর এক ট্রাক্টর ও ট্রাকে বালি পৌঁছে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে।
বোদা উপজেলার বেংহাড়ি ইউনিয়নের সরকারপাড়া এলাকার ট্রাক্টরচালক দ্বীপক ও হাজীপাড়া এলাকার আরিফ হোসেন জানান, সারাদিন বালি পরিবহন করে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন তারা। শুষ্ক মৌসুমে আয় কিছুটা বেশি হয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার আমতলা ও মীরগড় এবং তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর, বোদা উপজেলার ফুলতলা এলাকার শ্রমিকদের বক্তব্যও প্রায় একই। তাদের ভাষ্য, শত শত মানুষ বালি উত্তোলন ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। এই কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পরিবারে নেমে আসবে চরম অনিশ্চয়তা।
বালি উত্তোলনের সঙ্গে শুধু শ্রমিকরাই নন, জড়িত রয়েছেন ট্রাক-ট্রাক্টরের চালক, হেলপার, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। জেলার বিভিন্ন বালুমহাল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও ট্রাক্টরে বালি পরিবহন করা হয়।
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষাকালে বালির চাহিদা ও দাম কিছুটা বেড়ে যায়। দেবীগঞ্জের সুলতানপুর-পাখুরিতলা এলাকার কয়েকজন বালি ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে ১০ চাকার মোটা বালির একটি ট্রাক প্রায় ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এর দাম থাকে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।
চিকন বালির দাম বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। বর্ষাকালে প্রতিদিন একটি ব্যবসায়ীর ১০ থেকে ১২টি ট্রাক বালি সরবরাহ হলেও শুষ্ক মৌসুমে সরবরাহের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় বলে জানান তারা।
পঞ্চগড়ে বড় শিল্প-কারখানার সংখ্যা খুবই সীমিত। আগে যে দু-একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো এখন বন্ধ। ফলে চা চাষের পাশাপাশি বালি ও পাথরকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জেলার অনেক মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে।
বালি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিক থেকে শুরু করে ট্রাকচালক, হেলপার, পরিবহন মালিক, ব্যবসায়ী-সবাই কোনো না কোনোভাবে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তবে এই কর্মযজ্ঞের আড়ালে থাকা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন। মাথার ওপর তীব্র রোদ, কখনো বৃষ্টি, কখনো নদীর ঠান্ডা পানি-সবকিছু উপেক্ষা করে তারা বালি তোলেন। দিন শেষে তাদের আয় হয় কয়েকশ টাকা। সেই টাকা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যদিনের প্রয়োজন।
বালির এই বিশাল অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ আছে, আছে ট্রাক-ট্রাক্টর ও বাজারব্যবস্থা; কিন্তু শ্রমিকদের পুঁজি বলতে শুধু তাদের শরীরের শক্তি আর ঘাম।
তাই নদীর বুকে প্রতিদিন যে কর্মযজ্ঞ দেখা যায়, তার পেছনে থাকা এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবন-সংগ্রামের খবরও রাখা প্রয়োজন। কারণ বালি শুধু অর্থনীতির চালিকা শক্তি নয়-এই বালির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের জীবন ও স্বপ্ন।




















