ঢাকা ০৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নওগাঁয় সরিষার তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা লালমনিরহাটে শি’শু ধ/র্ষ/ণ মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন, লাখ টাকা জরিমানা মুন্সীগঞ্জে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ একজন গ্রেপ্তার শাকিল হ/ত্যা মামলায় এমপির ছেলে মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড রাণীনগরে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১০ দিনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর পরিষ্কারের নির্দেশ বালিয়াডাঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল যুবকের, বন্ধু হাসপাতালে পঞ্চগড়ে ১৭ দরিদ্র নারী পেলেন দুটি করে মা ছাগল পঞ্চগড় থেকে দেখা মিলছে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার পঞ্চগড় সীমান্তে ভারতে পাচারের আগে ৮ বস্তা সার উদ্ধার

অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ

মোঃ নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৪:৩৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬ ৩৩৬ বার পড়া হয়েছে

collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ

সীমান্তঘেঁষা ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হারাতে বসেছে ঠাকুরগাঁও, ভিউ পয়েন্টে বাড়ছে দর্শনার্থী

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের জগদল গ্রামে, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তঘেঁষা এক নীরব জনপদে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—রাজা শ্রী বীরেন্দ্রনাথের জগদল জমিদারবাড়ি। একসময়কার ঐশ্বর্য আর গৌরবের প্রতীক হলেও অযত্ন ও অবহেলায় আজ এটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

রাণীশংকৈল উপজেলা শহর থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদারবাড়িতে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। উপজেলা শহর থেকে নেকমরদ চৌরাস্তা পর্যন্ত চার্জার ভ্যান বা অটোতে পৌঁছানো যায় স্বল্প খরচে। এরপর নেকমরদ কলেজ রোড ধরে অটো বা রিজার্ভ ভ্যানে জগদল জমিদারবাড়ি। পথজুড়ে সবুজ ধানক্ষেত, নদীর কলকল ধ্বনি আর সীমান্ত এলাকার নিস্তব্ধতা যেন ইতিহাসের কোনো উপাখ্যানের সূচনা করে।

নদীমোহনা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

জগদল গ্রামে রয়েছে তীরনই ও নাগর নদীর মিলনস্থল—স্থানীয়দের ভাষায় ‘দুই নদীর মোহনা’। বাংলাদেশে এমন দ্বৈত নদীর মিলনস্থল খুবই বিরল। জমিদারবাড়ির পাশেই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প ও একটি প্রাচীন কালীমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যা পুরো এলাকাকে আরও ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছে।

ইতিহাসের সাক্ষী, অথচ অবহেলিত

জমিদারবাড়ির স্থাপনাগুলো এখন লতাগুল্ম ও বড় বড় বৃক্ষের আড়ালে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। বসতঘর, মন্দির, সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশ তোরণ এখনও দৃশ্যমান থাকলেও প্রতিটি কাঠামোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইট, চুন, কাঠ ও লোহার বর্গা দিয়ে নির্মিত ভবনগুলোর স্থাপত্যে তুস্কান স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও সমতল ছাদের ব্যবহার উনবিংশ শতাব্দীর জমিদার স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। বাড়ির পশ্চিম পাশে নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

রাজকুমার বীরেন্দ্রনাথ ও সাহিত্যচর্চা

জগদলের রাজকুমার শ্রী বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সুপণ্ডিত ও সাহিত্যপ্রেমী। ভারতের বাকীপুরের জমিদার রায় পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। বীরেন্দ্রনাথের গড়ে তোলা সমৃদ্ধ পাঠাগার ১৯৪৮ সালে দান করা হয় তৎকালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (বর্তমান দিনাজপুর সরকারি কলেজ)। সে সময় ওই পাঠাগারের বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা—যা ছিল বিপুল অঙ্ক।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শৈশবের কিছু সময় জগদল জমিদারবাড়িতে কাটিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে ২০১৪ সালে নির্মিত ‘হুমায়ূন মঞ্চ’ বর্তমানে অরক্ষিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

গেজেট হলেও নেই কার্যকর উদ্যোগ

২০২২ সালে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভর দায়ের করা রিটের পর ২০২৪ সালে জগদল জমিদারবাড়িটি সরকারিভাবে গেজেটেড হয়। তবে গেজেট প্রকাশের পরও কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় ভবনের আরও অংশ ভেঙে পড়ছে।

নদী ভিউ পয়েন্টে ভিড়, জমিদারবাড়িতে নীরবতা

জমিদারবাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে নাগর নদী ভিউ পয়েন্ট। বিকেলের আলো, নদীর ঢেউ ও সীমান্ত পিলারের আলোয় জায়গাটি এখন জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করলেও জমিদারবাড়ির দিকে তেমন নজর নেই।

সংরক্ষণে জোর দাবি

রাণীশংকৈল উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ জগদল জমিদারবাড়ি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভ বলেন, “আমরা আশা করছি পুরনো এই জমিদারবাড়িটি তার আগের রূপ ফিরে পাবে। এটিকে দর্শনীয় করে তুলতে সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই।”
স্থানীয়দের মতে, সরকার চাইলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব, যা থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হবে।

January 19, 2026
অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ
বিস্তারিত কমেন্টে...www.channelanews.com
Advertisement

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ

আপডেট সময় : ০৪:৩৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ

সীমান্তঘেঁষা ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হারাতে বসেছে ঠাকুরগাঁও, ভিউ পয়েন্টে বাড়ছে দর্শনার্থী

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের জগদল গ্রামে, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তঘেঁষা এক নীরব জনপদে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—রাজা শ্রী বীরেন্দ্রনাথের জগদল জমিদারবাড়ি। একসময়কার ঐশ্বর্য আর গৌরবের প্রতীক হলেও অযত্ন ও অবহেলায় আজ এটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

রাণীশংকৈল উপজেলা শহর থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদারবাড়িতে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। উপজেলা শহর থেকে নেকমরদ চৌরাস্তা পর্যন্ত চার্জার ভ্যান বা অটোতে পৌঁছানো যায় স্বল্প খরচে। এরপর নেকমরদ কলেজ রোড ধরে অটো বা রিজার্ভ ভ্যানে জগদল জমিদারবাড়ি। পথজুড়ে সবুজ ধানক্ষেত, নদীর কলকল ধ্বনি আর সীমান্ত এলাকার নিস্তব্ধতা যেন ইতিহাসের কোনো উপাখ্যানের সূচনা করে।

নদীমোহনা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

জগদল গ্রামে রয়েছে তীরনই ও নাগর নদীর মিলনস্থল—স্থানীয়দের ভাষায় ‘দুই নদীর মোহনা’। বাংলাদেশে এমন দ্বৈত নদীর মিলনস্থল খুবই বিরল। জমিদারবাড়ির পাশেই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প ও একটি প্রাচীন কালীমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যা পুরো এলাকাকে আরও ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছে।

ইতিহাসের সাক্ষী, অথচ অবহেলিত

জমিদারবাড়ির স্থাপনাগুলো এখন লতাগুল্ম ও বড় বড় বৃক্ষের আড়ালে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। বসতঘর, মন্দির, সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশ তোরণ এখনও দৃশ্যমান থাকলেও প্রতিটি কাঠামোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইট, চুন, কাঠ ও লোহার বর্গা দিয়ে নির্মিত ভবনগুলোর স্থাপত্যে তুস্কান স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও সমতল ছাদের ব্যবহার উনবিংশ শতাব্দীর জমিদার স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। বাড়ির পশ্চিম পাশে নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

রাজকুমার বীরেন্দ্রনাথ ও সাহিত্যচর্চা

জগদলের রাজকুমার শ্রী বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সুপণ্ডিত ও সাহিত্যপ্রেমী। ভারতের বাকীপুরের জমিদার রায় পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। বীরেন্দ্রনাথের গড়ে তোলা সমৃদ্ধ পাঠাগার ১৯৪৮ সালে দান করা হয় তৎকালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (বর্তমান দিনাজপুর সরকারি কলেজ)। সে সময় ওই পাঠাগারের বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা—যা ছিল বিপুল অঙ্ক।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শৈশবের কিছু সময় জগদল জমিদারবাড়িতে কাটিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে ২০১৪ সালে নির্মিত ‘হুমায়ূন মঞ্চ’ বর্তমানে অরক্ষিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

গেজেট হলেও নেই কার্যকর উদ্যোগ

২০২২ সালে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভর দায়ের করা রিটের পর ২০২৪ সালে জগদল জমিদারবাড়িটি সরকারিভাবে গেজেটেড হয়। তবে গেজেট প্রকাশের পরও কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় ভবনের আরও অংশ ভেঙে পড়ছে।

নদী ভিউ পয়েন্টে ভিড়, জমিদারবাড়িতে নীরবতা

জমিদারবাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে নাগর নদী ভিউ পয়েন্ট। বিকেলের আলো, নদীর ঢেউ ও সীমান্ত পিলারের আলোয় জায়গাটি এখন জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করলেও জমিদারবাড়ির দিকে তেমন নজর নেই।

সংরক্ষণে জোর দাবি

রাণীশংকৈল উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ জগদল জমিদারবাড়ি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভ বলেন, “আমরা আশা করছি পুরনো এই জমিদারবাড়িটি তার আগের রূপ ফিরে পাবে। এটিকে দর্শনীয় করে তুলতে সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই।”
স্থানীয়দের মতে, সরকার চাইলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব, যা থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হবে।

January 19, 2026
অযত্নে ধ্বংসের পথে জগদল জমিদারবাড়ি: গেজেট হলেও শুরু হয়নি সংরক্ষণ
বিস্তারিত কমেন্টে...www.channelanews.com
Advertisement