ঢাকা ১০:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে নদী-জলাধার রক্ষায় ৬ দফা দাবি

এম এম মামুন:
  • আপডেট সময় : ০৩:১৬:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ ১৪৮ বার পড়া হয়েছে

collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজশাহীতে নদী-জলাধার রক্ষায় ৬ দফা দাবি

নবগঙ্গা–বারাহী দখল-দূষণ বন্ধ ও পুনঃখননের আহ্বান

রাজশাহীর পদ্মা নদী থেকে উৎসারিত নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল-দূষণ বন্ধ এবং পুনঃখননের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১ মার্চ) বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টার সেমিনার কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামবারসিক

সংবাদ সম্মেলনে গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী, পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা খাতুন, বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বক্তব্য রাখেন।

বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরসংলগ্ন নদী, বিল ও জলাধারসমূহ মারাত্মক দূষণ, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। চরমভাবাপন্ন রাজশাহীর পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে স্বরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা নদী ও বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। একসময় স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব নদীর পানি বর্তমানে কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। তলদেশে পলি ও প্লাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে এবং মাছসহ জলজ প্রাণের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।

নগরের বিষাক্ত তরল বর্জ্য নিম্নাঞ্চলে জমা হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণাহার বিল। হাজার হাজার হেক্টর এসব বিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, জলজ উদ্ভিদ ও মাছের উৎপাদন কমে গেছে এবং বিলের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ চলতে থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংকট বৃহত্তর পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

৬ দফা দাবি:

১. পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা, বারাহী ও নবগঙ্গা নদী অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে।
২. রাজশাহী নগরের তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে।
৩. সকল শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) নিশ্চিত ও কঠোর মনিটরিং চালু করতে হবে।
৪. বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গা নদীসহ সংযোগ বিলসমূহে সরাসরি ড্রেন সংযোগ, দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে এবং উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৫. সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিলসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৬. নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধ করে সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুণ-যুব, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রাজশাহীতে নদী-জলাধার রক্ষায় ৬ দফা দাবি

আপডেট সময় : ০৩:১৬:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

রাজশাহীতে নদী-জলাধার রক্ষায় ৬ দফা দাবি

নবগঙ্গা–বারাহী দখল-দূষণ বন্ধ ও পুনঃখননের আহ্বান

রাজশাহীর পদ্মা নদী থেকে উৎসারিত নবগঙ্গা ও বারাহী নদী দখল-দূষণ বন্ধ এবং পুনঃখননের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১ মার্চ) বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টার সেমিনার কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামবারসিক

সংবাদ সম্মেলনে গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী, পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা খাতুন, বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বক্তব্য রাখেন।

বক্তারা বলেন, রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরসংলগ্ন নদী, বিল ও জলাধারসমূহ মারাত্মক দূষণ, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। চরমভাবাপন্ন রাজশাহীর পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য প্রবাহিত হয়ে স্বরমঙ্গলা নদী, বারাহী নদী, নবগঙ্গা নদী ও বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। একসময় স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব নদীর পানি বর্তমানে কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। তলদেশে পলি ও প্লাস্টিক জমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে এবং মাছসহ জলজ প্রাণের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে স্থানীয় জেলেরা আয় হারাচ্ছেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত চরিত্র নষ্ট হচ্ছে।

নগরের বিষাক্ত তরল বর্জ্য নিম্নাঞ্চলে জমা হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিল ও কর্ণাহার বিল। হাজার হাজার হেক্টর এসব বিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, জলজ উদ্ভিদ ও মাছের উৎপাদন কমে গেছে এবং বিলের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দূষিত পানি দিয়ে চাষাবাদ চলতে থাকায় মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ ও দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিস্থিতি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের প্রশ্ন। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংকট বৃহত্তর পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

৬ দফা দাবি:

১. পদ্মা থেকে উৎসারিত স্বরমঙ্গলা, বারাহী ও নবগঙ্গা নদী অবিলম্বে দখল-দূষণমুক্ত করতে হবে।
২. রাজশাহী নগরের তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) স্থাপন ও কার্যকর করতে হবে।
৩. সকল শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) নিশ্চিত ও কঠোর মনিটরিং চালু করতে হবে।
৪. বারনই, বারাহী ও নবগঙ্গা নদীসহ সংযোগ বিলসমূহে সরাসরি ড্রেন সংযোগ, দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে এবং উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৫. সাপমারার বিল, বকমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড়বাড়িয়া বিলসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৬. নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধ করে সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুণ-যুব, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।