বাগাতিপাড়ার শেষ কারিগর বিশ্বরূপ, তাঁর হাতেই টিকে আছে শতবর্ষী কাঠের চাকার ঐতিহ্য
- আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ ৭৪ বার পড়া হয়েছে

বাগাতিপাড়ার শেষ কারিগর বিশ্বরূপ, তাঁর হাতেই টিকে আছে শতবর্ষী কাঠের চাকার ঐতিহ্য
একসময় ভোরের নীরবতা ভেঙে নাটোরের বাগাতিপাড়ার গ্রামগুলো মুখর হয়ে উঠত হাতুড়ি-বাটালের খটখট শব্দে। সেই শব্দই জানান দিত কাঠের গরুর গাড়ির চাকা তৈরির ব্যস্ত কর্মযজ্ঞের। সময়ের পরিবর্তন, যান্ত্রিক যানবাহনের বিস্তার এবং কাঠের চাকার চাহিদা কমে যাওয়ায় আজ সেই শব্দ প্রায় হারিয়ে গেছে। উপজেলার একসময়কার অন্তত ৩০টি কাঠের চাকা তৈরির কারখানার মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র একটি। আর সেই কারখানায় একাই কাজ করে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ৬৮ বছর বয়সী কারিগর বিশ্বরূপ সূত্রধর।
উপজেলার দয়ারামপুর ইউনিয়নের বাটিকামারি গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বরূপ সূত্রধর। তিনি প্রয়াত বিপদ ভন্দন সূত্রধরের ছেলে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে এই পেশায় যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে কাঠের চাকা তৈরির কাজে নিয়োজিত তিনি। গত ৩৮ বছর ধরে উপজেলার নন্দীকুজা গ্রামের উত্তম কুমার রায়ের কারখানায় একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বাগাতিপাড়ার জামনগর, তমালতলা, চকগোয়াস, মালঞ্চি, বাটিকামারি ও নন্দীকুজা এলাকায় অন্তত ৩০টি কাঠের চাকা তৈরির কারখানা ছিল। প্রতিটি কারখানায় তিন থেকে পাঁচজন দক্ষ কারিগর কাজ করতেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে গরুর গাড়ির কাঠের চাকা কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু কৃষি ও পরিবহনে যান্ত্রিকীকরণের ফলে ধীরে ধীরে কাঠের চাকার ব্যবহার কমে যায়। একে একে বন্ধ হয়ে যায় প্রায় সব কারখানা। বর্তমানে নন্দীকুজা গ্রামের একটি কারখানাই এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পের শেষ আশ্রয়স্থল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো সেই কারখানার এক কোণে বসে ভারী হাতুড়ি ও বাটালের আঘাতে বাবলা কাঠে নিখুঁতভাবে ছিদ্র করছেন বিশ্বরূপ সূত্রধর। প্রায় দুই কেজি ওজনের হাতুড়ি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে একটি চাকা তৈরি করতে তাঁর সময় লাগে প্রায় তিন দিন। অথচ এই কঠোর শ্রমের বিনিময়ে তাঁর দৈনিক মজুরি মাত্র ৩০০ টাকা।
বিশ্বরূপ সূত্রধর বলেন, ১৪-১৫ বছর বয়সে এই পেশায় নামি। তখন আমার দৈনিক মজুরি ছিল ১০ টাকা। এক জোড়া কাঠের চাকার দাম ছিল মাত্র ৬০ টাকা। এখন একটি চাকার দাম প্রায় ৬ হাজার টাকা হলেও আমার দৈনিক মজুরি মাত্র ৩০০ টাকা। কাজটি খুবই কষ্টের। সারাদিন ভারী হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে কাজ করতে হয়। এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো পেশা শিখিনি। তাই শরীর যতদিন সাড়া দেবে, ততদিন এই কাজই করে যেতে চাই।
আক্ষেপের সুরে তিনি আরও বলেন, একসময় আমার সঙ্গে অনেক কারিগর কাজ করতেন। তাঁদের বেশির ভাগই এখন আর বেঁচে নেই। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না। তাই আমার পর এই শিল্প টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।
বর্তমান কারখানার মালিক উত্তম কুমার রায় জানান, তাঁর বাবা প্রয়াত গুলমনি রায়ের হাত ধরে এই কারখানার যাত্রা শুরু। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই দায়িত্ব নেন। তিনি বলেন,
এটি শুধু আমাদের পারিবারিক পেশা নয়, আমাদের এলাকার শতবর্ষী ঐতিহ্য। কয়েক বছর আগেও এখানে চার-পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। এখন শুধু বিশ্বরূপদাই আছেন। তিনি যদি একদিন কাজ ছেড়ে দেন, তাহলে হয়তো বাগাতিপাড়ায় কাঠের চাকা তৈরির ইতিহাসও শেষ হয়ে যাবে।
উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস গ্রামের প্রবীণ কারিগর বীরেন্দ্রনাথ জানান, তিনি টানা ৫৬ বছর এই পেশায় ছিলেন। কিন্তু কাজের সংকট ও অপ্রতুল আয়ের কারণে প্রায় নয় বছর আগে বাধ্য হয়ে কাঠের চাকা তৈরির কাজ ছেড়ে ফার্নিচার তৈরির কাজে যোগ দেন।
স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামীণ জনপদের ইতিহাস, কৃষি সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কাঠের গরুর গাড়ির চাকা। অথচ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে চলে গেছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু ইতিহাসের পাতাতেই দেখতে পাবে এই কারুশিল্পের নাম।
এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। বিশ্বরূপ সূত্রধরের মতো দক্ষ কারিগরদের পাশে থেকে তাঁদের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করা এই শিল্প আজ একজন মানুষের হাতে টিকে আছে। বিশ্বরূপ সূত্রধরের হাতের প্রতিটি হাতুড়ির আঘাত যেন শুধু একটি কাঠের চাকা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের শেষ নিঃশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর মতো কারিগরদের যথাযথ স্বীকৃতি, পৃষ্ঠপোষকতা ও সংরক্ষণ উদ্যোগই পারে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে।



















