জ্যান্ত মাছ সরবরাহে দেশের শীর্ষে রাজশাহী, প্রতিদিন বিক্রি ২০ কোটি টাকার মাছ
- আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে

জ্যান্ত মাছ সরবরাহে দেশের শীর্ষে রাজশাহী, প্রতিদিন বিক্রি ২০ কোটি টাকার মাছ
জ্যান্ত মাছ উৎপাদন ও সরবরাহে দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী। প্রতিদিন দুই শতাধিক ট্রাকে জীবন্ত মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন মাছচাষিরা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতারা পাচ্ছেন তাজা ও ফরমালিনমুক্ত মাছ।
রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জীবন্ত মাছ পরিবহনের কার্যকর পদ্ধতি প্রথম উদ্ভাবন করেন রাজশাহীর মাছচাষিরাই। বর্তমানে রাজশাহীর পবা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, বাগমারা ও মোহনপুর উপজেলার পাশাপাশি নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলার চাষিরাও এই পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ সরবরাহ করছেন। শুধু রাজশাহী জেলা থেকেই প্রতিদিন দুই শতাধিক ট্রাকে জীবন্ত মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
রাজশাহী বিভাগে বর্তমানে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন বিক্রি হওয়া মাছের বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাবদাসহ কয়েকটি দেশীয় মাছ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিভাগের আটটি জেলায় মোট ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুর রয়েছে এবং মাছচাষে যুক্ত আছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ জন চাষি। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছর নতুন নতুন উদ্যোক্তাও এ খাতে যুক্ত হচ্ছেন। কৃষিতে লোকসানের কারণে অনেক কৃষক জমিতে পুকুর খনন করে মাছচাষে ঝুঁকছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, আগে শুধু রাজশাহীতেই মিশ্র পদ্ধতিতে মাছচাষ হতো, এখন তা পুরো বিভাগে বিস্তৃত হয়েছে। রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্পের পাশাপাশি পাবদা, শিং, কই, মাগুর, টেংরাসহ দেশীয় মাছের বাণিজ্যিক উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে চাষিদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় ২৪ বছর আগে রাজশাহী থেকে জীবন্ত মাছ পরিবহন শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ অন্তত ২৫টি জেলায় প্রতিদিন জীবন্ত মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে রাজশাহীর মাছের চাহিদা ও বাজার উভয়ই সম্প্রসারিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোররাতের মধ্যে প্রায় ৫০০ ট্রাক জীবন্ত মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ পরিবহন করা হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে ট্রাকে পানি ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকায় মাছ জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন বর্তমানে জীবন্ত মাছ সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। এখান থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫০টি ট্রাক মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। পুরো রাজশাহী জেলা থেকে প্রতিদিন দুই শতাধিক ট্রাকে মাছ পরিবহন করা হয়।
পারিলা গ্রামের মাছচাষি মোশারফ হোসেন জানান, আগে স্থানীয় বাজারেই মাছ বিক্রি করতে হতো, ফলে দাম কম পাওয়া যেত। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাকে জীবন্ত মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। এতে বাজারমূল্যও ভালো পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, দুর্গাপুর উপজেলার সফল উদ্যোক্তা গোলাম সাকলাইন ১৯৯৪ সালে মাত্র দুই বিঘা জমিতে মাছচাষ শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তিনি প্রায় এক হাজার বিঘা পুকুরে মাছচাষ করছেন এবং তার প্রতিষ্ঠানে ১৫২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন তার খামার থেকেই প্রায় ২০টি ট্রাক মাছ রাজধানীতে পাঠানো হয়।
তবে মাছচাষিদের অভিযোগ, মাছের খাদ্যের দাম বাড়লেও সে অনুপাতে মাছের দাম বাড়েনি। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে এসেছে।
দুর্গাপুর উপজেলার আরেক মাছচাষি ইদ্রিস আলী বলেন, ঢাকায় মাছ পাঠাতে এখন অতিরিক্ত তিন থেকে চার হাজার টাকা ট্রাকভাড়া গুনতে হচ্ছে। সরকারি আর্থিক সহায়তা না থাকলেও মৎস্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ তাদের কাজে সহায়তা করছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশিক্ষণ এবং নতুন প্রজাতির মাছচাষের কারণে রাজশাহীতে মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খাঁচায় মাছচাষ, দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণ এবং রপ্তানিযোগ্য মাছ উৎপাদনের মাধ্যমে এ অঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।



















