জাতীয় যুব পুরস্কারে দেশজুড়ে দ্বিতীয় লালপুরের রায়হান
- আপডেট সময় : ০৯:২৮:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় যুব পুরস্কারে দেশজুড়ে দ্বিতীয় লালপুরের রায়হান
সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে জাতীয় স্বীকৃতি; কৃষি, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন খাতে উদ্যোগ গড়ে কর্মসংস্থান করেছেন শতাধিক মানুষের।
এস ইসলাম, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধিঃ
জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬-এ সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক মো. আব্দুল মোত্তালেব রায়হান। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আয়োজিত জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠানে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল-‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।
লালপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা রায়হান। তার বাবা মজিবর রহমান এবং মা রওশনআরা বেগম। ২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ছয়টি গরু দিয়ে খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু। বর্তমানে কৃষি, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যাংকিং ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে তার একাধিক উদ্যোগ রয়েছে।
মৎস্য খাতে নিজের উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় চাষিদের মাছ বিক্রির সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’। অন্যদিকে, মিশ্র ফলবাগানে জৈব পদ্ধতিতে ফল উৎপাদন এবং ‘আশার আলো জৈব সার কারখানা’র মাধ্যমে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। এসব জৈব সার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটিতে বসবাসরত রুশ নাগরিকদের জন্য উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল চাষেও ব্যবহার করা হচ্ছে। সার কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ৩০ জন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লিড টপার’ ও ‘হলিটেক আইটি’। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে প্রায় ৩০০ তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ জন কর্মরত এবং ১০০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
লালপুরের কৃষকদের সেচসংকট নিরসনে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও উদ্যোগের মাধ্যমে ২৪টি গভীর নলকূপ স্থাপনে সহযোগিতা করেছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ডক্টরস পয়েন্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিক সেন্টার’, যেখানে প্রায় ২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ইসলামী ব্যাংকের গোপালপুর ও আব্দুলপুরে দুটি এজেন্ট শাখা প্রতিষ্ঠা করেন রায়হান। ২০২০ ও ২০২১ সালে চালু হওয়া শাখা দুটিতে ১৪ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া জনতা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির লালপুর অফিসের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন এবং পিএসপি এক্সপ্রেস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে কুরিয়ার সেবা দিয়ে আসছেন।
ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সক্রিয় রায়হান। তিনি গ্রীন লালপুর প্রকল্পের সমন্বয়ক, গ্রীন ভয়েসের লালপুর উপজেলা শাখার উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) লালপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। এসব সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নেন।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মাস্ক বিতরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অসহায় ও আক্রান্ত মানুষের বাড়িতে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেন। এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
শিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়া মেরিনা, ফাতেমা, সানজিদা ও প্রার্থনাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং তাঁর সভাপতিত্বে লালপুরের দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে ‘আলোর দরজা শিশু বিদ্যা নিকেতন’।
সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা ও অনিয়ম তুলে ধরেছেন রায়হান। বিভিন্ন অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিকার আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পুরোনো সরকার টেক্সটাইল স্থানান্তরের প্রতিবাদ এবং সামাজিক বনায়নের গাছ রোপণসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা নিরসনে তাঁর নেতৃত্বে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। গণমানুষের কথা তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘লালপুর বার্তা’।
ছাত্রাবস্থা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), বাংলাদেশ স্কাউটস ও রোভার স্কাউটসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। সাংবাদিকতা বিষয়েও একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
রায়হানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিভিন্ন উদ্যোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এ স্বীকৃতি পাওয়ায় লালপুরের স্থানীয় সচেতন মহল ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, তাঁর এ অর্জন এলাকার তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করবে।












