লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী
- আপডেট সময় : ০৮:৫৭:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ ১২৫ বার পড়া হয়েছে

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায়, চলে গেলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী
মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ও সংগ্রামের ইতিহাস বুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি, নির্যাতনের ক্ষত আর দীর্ঘ জীবনের বেদনা বুকে নিয়েই চিরবিদায় নিলেন বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার এই নারী মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি।
বুধবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামের প্রবাসী রাজুর মিল চাতালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে এ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে স্থানীয় শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৬ থেকে ১৭ বছর। চারদিকে আতঙ্ক, ধ্বংস আর প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রামের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের রক্ষার আশায় তাঁর বাবা বাধ্য হয়ে তাঁকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দেন।
এরপর দীর্ঘ সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। স্বাধীনতার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসেন। পরে জন্ম হয় তাঁর ছেলে সুধীর রায়ের। তবে স্বাধীনতার পরও তাঁর জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়নি। সমাজের একাংশ দীর্ঘদিন তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে অবহেলা ও কটূক্তির শিকার করেছে।
স্বজনরা জানান, শত প্রতিকূলতার মাঝেও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে ছিলেন টেপরী রাণী। তাঁর ছেলে সুধীর রায় বর্তমানে ভ্যানচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
দীর্ঘদিন অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য, জীবনের শেষ সময়ে এ স্বীকৃতি তাঁকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিয়েছিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “টেপরী রাণী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর জীবন আমাদের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, কষ্ট ও সংগ্রামের গভীরতা মনে করিয়ে দেয়।”
জীবদ্দশায় টেপরী রাণীর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা।
অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বিদায় নিলেও বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীর জীবনগাথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।




















