ঢাকা ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাগাতিপাড়ায় ১২ দিন ধরে নিখোঁজ মানসিক প্রতিবন্ধী যুবক, সন্ধান চেয়ে পরিবারের আকুতি চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগে নাটোরে মা ও শিশু সদনে ভাঙচুর, নবজাতকের মৃত্যু গোদাগাড়ীতে সজিনা গাছের ডাল কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গৃহবধূর মৃত্যু রাজশাহীতে কি’শোরী ধ র্ষ ণ মামলায় ধর্মযাজক বেকসুর খালাস সাপাহারে অবৈধ ‘আম তোলা’ চক্রের ৫ সদস্য গ্রেফতার গোদাগাড়ীতে এনসিপির ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ ও সমাবেশ পঞ্চগড়ে একই দিনে সাপের কামড়ে আহত দুই; একজনকে দেওয়া হয়েছে এন্টিভেনাম, অন্যজন পর্যবেক্ষণে মান্দায় জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি ২০০ পরিবার; প্রশাসনের উদ্যোগে শুকনো খাবার বিতরণ মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়নে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব: ভূমিমন্ত্রী পঞ্চগড়ে গরু নিয়ে নদী পার হতে গিয়ে পানিতে ডুবে বৃদ্ধের মৃত্যু

রাণীশংকৈলের নির্ভীত পল্লীতে গড়ে ওঠা সাগরিকা নারী ফুটবলের সম্পদ!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ৫১২ বার পড়া হয়েছে

নারী ফুটবলের সম্পদ সাগরিকা

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাণীশংকৈলের নির্ভীত পল্লীতে গড়ে ওঠা সাগরিকা নারী ফুটবলের সম্পদ!

নাজমুল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি:
সদ্য শেষ হওয়া সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ড্র করে যৌথ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকেই ফাইনালে উঠেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে আলোচনার শিরোনাম এখন সাগরিকা। যার এক মাত্র গোলে ফাইনালে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ নারী দল।

তিন ম্যাচে চার গোল করে নজর কেড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই নারী ফুটবলার সাগরিকা।গত শুক্রবার কমলাপুর স্টেডিয়ামে খেলা যখন নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ। যোগ হওয়া অতিরিক্ত ৪ মিনিটের খেলা চলছে এবং ভারত ১ গোলে চাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে এই ভেবে স্টেডিয়ামের চেয়ার ছেড়ে অনেকেই বেড়িয়ে পড়েছেন বাহিরে।

কারণ খেলা প্রেমিরা প্রায় নিশ্চিত যে কোনও মুহূর্তে রেফারির শেষ বাঁশি আর ভারতের জয় নিশ্চিত। গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশের সমর্থক ও দর্শক যখন গোমরা মনে গ্যালারি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় তিন জন পেলেয়ার কে ফাঁকি দিয়ে সাগরিকার অসাধারণ গোলে কেপে উঠে কমলাপুরে স্টেডিয়াম। আর সেই একমাত্র গোলটি করেছেন মোসাম্মৎ সাগরিকা। তার আগে নেপালের বিরুদ্ধে করেন জোড়া গোল ও ভারতের জালে গোল করেন ১ টি।আর ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে মোসাম্মাৎ সাগরিকার গোলে সমতায় ফেরে। পরে টাইব্রেকারে দুই দলের ১০ টি করে উভয় পক্ষই গোল করেন পরে দুই দেশের গোল কিপার ১টি করে বল গোল করে সবাই বল জালে জড়ান। শেষ পর্যন্ত যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশ ও ভারতকে।

কিন্তু কে এই সাগরিকা?
সাগরিকার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হোসেনগাঁও ইউনিয়নের রাঙ্গাটুঙ্গী গ্রামে। রানীশংকৈল- হরিপুর পাকা সড়কের বলিদ্বারা রাঙ্গাটুঙ্গী স্কেল নামক এলাকায় পাকা রাস্তার পাশে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান সাগরিকার বাবা লিটন আলী ও মা মোছাঃ আনজু বেগম। দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে সাগরিকা ছোট। আর ছেলে মো: সাগর একটি ইট ভাটায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। বাবা লিটনও আগে ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দু বছর আগে রাস্তার পাশে সেই পুর্ণ ডিজিটাল ব্রিজ স্কেলের মালিকের কাছ থেকে বিনা ভাড়ায় একটি ছোট চা বিস্কুটের দোকান শুরু করে। লিটন ও তার স্ত্রী আনজু মিলে সেই দোকান চালিয়ে কোন মতে চলে তাদের সংসার। রাস্তার ধারেই একটু যেতেই তাদের বাড়ি। বাড়িতে যাওয়ার ঠিকমতো নেই ভালো রাস্তাও তবে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি খড়ের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং খড় ও টিন দিয়ে দুই ঘর বিশিষ্ট নির্মিত জরাজীর্ণ একটি বাড়ি বাড়ির আঙ্গীনায় বাধা রয়েছে ভবিষ্যৎ সম্ভল হিসেবে ছোট দুটি গরু।

মুলত সাগরিকা ৯ বছর বয়সে রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড প্রমিলা ফুটবল একাডেমিতে খেলা শুরু করে অধ্যক্ষ তাজুল ইসলামের মহিলা দলে। সেখানে টানা ৬ বছর খেলার পর ওই একাডেমিরর পরিচালক তাজুল ইসলামের প্রচেষ্টায় বিকেএসপিতে ভর্তি হন। বিকেএসপির কোঠর নিয়ম কানুন সাগরিকার ভালো লাগেনি। তাই ৪ মাস পর আবার নিজ মাঠ ফিরে আসেন রাঙ্গাটুঙ্গীতে। এরপর রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির পরিচালক তাজুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন ক্লাবে লীগ খেলা শুরু করেন সাগরিকা। ওইসব লীগ খেলার সময় সে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দক্ষ খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলেন। আর তখনি জাতীয় টিমের কোচের নজরে পড়ে সাগরিকা। এখন সে ১ বছর ধরে ন্যাশনাল টিমের হয়ে খেলছেন।

সোমবার ১২ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ফুটবল খেলার শুরুটা সাগরিকার সহজ ছিলনা গ্রামের মানুষজন অনেক কটুকথা শুনিয়েছে তার পরিবারকে। হাফপেন্ট জার্সি পরে ফুটবল খেলা। ধর্ম সার্পোট করেনা। মেয়র বিয়ে হবেনা। ইত্যাদি ইত্যাদি। সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলতেছিলেন সাগরিকার বাবা লিটন আলী। তিনি আরো বলেন এজন্য মেয়ের খেলা বন্ধ করে দিছিলাম। পরে লুকিয়ে লুকিয়ে সে মাঠে যেতো, এ কথা শুনে এক মাস মেয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিছিলাম। তবু্ও থেকে থাকেনি সাগরিকা সে খেলাকেই আরো বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন আর বাবার ভুল ভাংতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। একদিন হঠাৎ করেই সাগরিকার ডাক আসে সিঙ্গাপুরে খেলতে যাওয়ার এই কথা শুনে বাবা লিটনের চোখ কপালে উঠে মেয়ের এই সাফল্যের কথা শুনে।এই সাফল্যের কথা শুনার পর আর সাগরিকা কে খেলাতে বাধা দেয়নি তার বাবা যুগিছেন নানান ধরনের সাহস।
সাগরিকার বাবা মা জানান মেয়েকে ঠিকমতো কোন দিন ভালোমন্দ খাওয়াতে পারিনি এবং কি সে অনেক দিন না খেয়েও মাঠে অনুশীলন করতে গেছে।মেয়ে টাকে ঠিকমতো যত্ন নিতে পারিনি অভাবের কারণে।

কিন্তু সেই সাগরিকা আজ দেশের ফুটবলের এক অন্যন্য সম্পদ হয়ে উঠেছে। এটা এখন ভাবতেই বুক গর্বে ভরে উঠে বলেন লিটন আলী। সাগরিকার ভাই মো: সাগর ইসলাম বলেন, আমার বিভিন্ন এলাকায় খেলে যে পুরস্কার অর্জন করেছিলেন আমার বোন সেগুলো রাখার মত আমাদের একটা জায়গা নেই সেই পুরুস্কার গুলো আজোও চা দোকানের মধ্যেই পড়ে রয়েছে।তবে আমাকে আগে তেমন কেউ চিনতো না আমার বোন সাগরিকা ফুটবল খেলায় ভালো সুনাম অর্জন করায় এখন আমাকে অনেকেই দূর থেকে বলে এটা ফুটবল খেলোয়াড় সাগরিকার ভাই আর এই কথা শুনে বুক গর্বে ভরে যায় ভাই হিসেবে।দোয়া করি বোন যেন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারে।

এদিকে সাগরিকার মামা মো: সাঈদ বলেন,ভাগনীর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত এলাকায় এখন অনেকেই সম্মান করে দূর থেকেই বলে এটা সাগরিকার মামা এই শুনেই মন ভরে যায় তবে সাগরিকা খেলতে যাওয়ার আগে সব সময় আমার কাছে পরামর্শ নিতে আসতো তাকে সব সময় সাহস যুগিয়েছি। সাগরিকা নিজ এলাকা নন্দুয়ায় ইউনিয়নের পৃর্ব বলদ্বানী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর বলিদ্বাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন।তার সাফল্য এলাকায় এখন আনন্দ উল্লাস বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাটেড ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা তাজুল ইসলাম জানান,সাগরিকা আমাদের একাডেমিতে গত ছয় বছর ধরে খেলছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি থেকে কয়েকজন মেয়েকে বিকেএসপিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সাগরিকা সেখানে গিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। পরে গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর সেই রাঙ্গাটুঙ্গী থেকেই সাগরিকাকে অন্য নারী ফুটবলারদের সঙ্গে দলে ভেড়ায় মেয়েদের ফুটবল লিগের দল এফসি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। মেয়েদের লিগে সাগরিকা পাল্লা দিয়েছেন দেশের শীর্ষ নারী ফুটবলারদের সঙ্গে। সেবার সাগরিকা গোল করেছিলেন ১০টি। এরপরই মেয়েদের ফুটবলের সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন তাকে নিয়ে আসেন মেয়েদের বয়স ভিত্তিক দলে। সেই থেকে বাংলাদেশের জার্সিতে ফুটবল শুরু সাগরিকার। তার জন্য বাংলাদেশ আজ গর্বিত। এবং নিভৃত পল্লীর সাগরিকা এখন দেশের অন্যতম সেরা নারী ফুটবল তারকা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রাণীশংকৈলের নির্ভীত পল্লীতে গড়ে ওঠা সাগরিকা নারী ফুটবলের সম্পদ!

আপডেট সময় : ০৪:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

রাণীশংকৈলের নির্ভীত পল্লীতে গড়ে ওঠা সাগরিকা নারী ফুটবলের সম্পদ!

নাজমুল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি:
সদ্য শেষ হওয়া সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ড্র করে যৌথ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকেই ফাইনালে উঠেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে আলোচনার শিরোনাম এখন সাগরিকা। যার এক মাত্র গোলে ফাইনালে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ নারী দল।

তিন ম্যাচে চার গোল করে নজর কেড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই নারী ফুটবলার সাগরিকা।গত শুক্রবার কমলাপুর স্টেডিয়ামে খেলা যখন নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ। যোগ হওয়া অতিরিক্ত ৪ মিনিটের খেলা চলছে এবং ভারত ১ গোলে চাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে এই ভেবে স্টেডিয়ামের চেয়ার ছেড়ে অনেকেই বেড়িয়ে পড়েছেন বাহিরে।

কারণ খেলা প্রেমিরা প্রায় নিশ্চিত যে কোনও মুহূর্তে রেফারির শেষ বাঁশি আর ভারতের জয় নিশ্চিত। গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশের সমর্থক ও দর্শক যখন গোমরা মনে গ্যালারি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় তিন জন পেলেয়ার কে ফাঁকি দিয়ে সাগরিকার অসাধারণ গোলে কেপে উঠে কমলাপুরে স্টেডিয়াম। আর সেই একমাত্র গোলটি করেছেন মোসাম্মৎ সাগরিকা। তার আগে নেপালের বিরুদ্ধে করেন জোড়া গোল ও ভারতের জালে গোল করেন ১ টি।আর ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে মোসাম্মাৎ সাগরিকার গোলে সমতায় ফেরে। পরে টাইব্রেকারে দুই দলের ১০ টি করে উভয় পক্ষই গোল করেন পরে দুই দেশের গোল কিপার ১টি করে বল গোল করে সবাই বল জালে জড়ান। শেষ পর্যন্ত যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশ ও ভারতকে।

কিন্তু কে এই সাগরিকা?
সাগরিকার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হোসেনগাঁও ইউনিয়নের রাঙ্গাটুঙ্গী গ্রামে। রানীশংকৈল- হরিপুর পাকা সড়কের বলিদ্বারা রাঙ্গাটুঙ্গী স্কেল নামক এলাকায় পাকা রাস্তার পাশে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান সাগরিকার বাবা লিটন আলী ও মা মোছাঃ আনজু বেগম। দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে সাগরিকা ছোট। আর ছেলে মো: সাগর একটি ইট ভাটায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। বাবা লিটনও আগে ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দু বছর আগে রাস্তার পাশে সেই পুর্ণ ডিজিটাল ব্রিজ স্কেলের মালিকের কাছ থেকে বিনা ভাড়ায় একটি ছোট চা বিস্কুটের দোকান শুরু করে। লিটন ও তার স্ত্রী আনজু মিলে সেই দোকান চালিয়ে কোন মতে চলে তাদের সংসার। রাস্তার ধারেই একটু যেতেই তাদের বাড়ি। বাড়িতে যাওয়ার ঠিকমতো নেই ভালো রাস্তাও তবে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি খড়ের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং খড় ও টিন দিয়ে দুই ঘর বিশিষ্ট নির্মিত জরাজীর্ণ একটি বাড়ি বাড়ির আঙ্গীনায় বাধা রয়েছে ভবিষ্যৎ সম্ভল হিসেবে ছোট দুটি গরু।

মুলত সাগরিকা ৯ বছর বয়সে রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড প্রমিলা ফুটবল একাডেমিতে খেলা শুরু করে অধ্যক্ষ তাজুল ইসলামের মহিলা দলে। সেখানে টানা ৬ বছর খেলার পর ওই একাডেমিরর পরিচালক তাজুল ইসলামের প্রচেষ্টায় বিকেএসপিতে ভর্তি হন। বিকেএসপির কোঠর নিয়ম কানুন সাগরিকার ভালো লাগেনি। তাই ৪ মাস পর আবার নিজ মাঠ ফিরে আসেন রাঙ্গাটুঙ্গীতে। এরপর রাণীশংকৈল রাঙ্গাটুঙ্গী প্রমিলা ফুটবল একাডেমির পরিচালক তাজুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন ক্লাবে লীগ খেলা শুরু করেন সাগরিকা। ওইসব লীগ খেলার সময় সে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দক্ষ খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলেন। আর তখনি জাতীয় টিমের কোচের নজরে পড়ে সাগরিকা। এখন সে ১ বছর ধরে ন্যাশনাল টিমের হয়ে খেলছেন।

সোমবার ১২ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ফুটবল খেলার শুরুটা সাগরিকার সহজ ছিলনা গ্রামের মানুষজন অনেক কটুকথা শুনিয়েছে তার পরিবারকে। হাফপেন্ট জার্সি পরে ফুটবল খেলা। ধর্ম সার্পোট করেনা। মেয়র বিয়ে হবেনা। ইত্যাদি ইত্যাদি। সাক্ষাৎকারে এমনটিই বলতেছিলেন সাগরিকার বাবা লিটন আলী। তিনি আরো বলেন এজন্য মেয়ের খেলা বন্ধ করে দিছিলাম। পরে লুকিয়ে লুকিয়ে সে মাঠে যেতো, এ কথা শুনে এক মাস মেয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিছিলাম। তবু্ও থেকে থাকেনি সাগরিকা সে খেলাকেই আরো বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন আর বাবার ভুল ভাংতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। একদিন হঠাৎ করেই সাগরিকার ডাক আসে সিঙ্গাপুরে খেলতে যাওয়ার এই কথা শুনে বাবা লিটনের চোখ কপালে উঠে মেয়ের এই সাফল্যের কথা শুনে।এই সাফল্যের কথা শুনার পর আর সাগরিকা কে খেলাতে বাধা দেয়নি তার বাবা যুগিছেন নানান ধরনের সাহস।
সাগরিকার বাবা মা জানান মেয়েকে ঠিকমতো কোন দিন ভালোমন্দ খাওয়াতে পারিনি এবং কি সে অনেক দিন না খেয়েও মাঠে অনুশীলন করতে গেছে।মেয়ে টাকে ঠিকমতো যত্ন নিতে পারিনি অভাবের কারণে।

কিন্তু সেই সাগরিকা আজ দেশের ফুটবলের এক অন্যন্য সম্পদ হয়ে উঠেছে। এটা এখন ভাবতেই বুক গর্বে ভরে উঠে বলেন লিটন আলী। সাগরিকার ভাই মো: সাগর ইসলাম বলেন, আমার বিভিন্ন এলাকায় খেলে যে পুরস্কার অর্জন করেছিলেন আমার বোন সেগুলো রাখার মত আমাদের একটা জায়গা নেই সেই পুরুস্কার গুলো আজোও চা দোকানের মধ্যেই পড়ে রয়েছে।তবে আমাকে আগে তেমন কেউ চিনতো না আমার বোন সাগরিকা ফুটবল খেলায় ভালো সুনাম অর্জন করায় এখন আমাকে অনেকেই দূর থেকে বলে এটা ফুটবল খেলোয়াড় সাগরিকার ভাই আর এই কথা শুনে বুক গর্বে ভরে যায় ভাই হিসেবে।দোয়া করি বোন যেন দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারে।

এদিকে সাগরিকার মামা মো: সাঈদ বলেন,ভাগনীর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত এলাকায় এখন অনেকেই সম্মান করে দূর থেকেই বলে এটা সাগরিকার মামা এই শুনেই মন ভরে যায় তবে সাগরিকা খেলতে যাওয়ার আগে সব সময় আমার কাছে পরামর্শ নিতে আসতো তাকে সব সময় সাহস যুগিয়েছি। সাগরিকা নিজ এলাকা নন্দুয়ায় ইউনিয়নের পৃর্ব বলদ্বানী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর বলিদ্বাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন।তার সাফল্য এলাকায় এখন আনন্দ উল্লাস বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাটেড ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা তাজুল ইসলাম জানান,সাগরিকা আমাদের একাডেমিতে গত ছয় বছর ধরে খেলছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাঙ্গাটুঙ্গী ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি থেকে কয়েকজন মেয়েকে বিকেএসপিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সাগরিকা সেখানে গিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। পরে গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর সেই রাঙ্গাটুঙ্গী থেকেই সাগরিকাকে অন্য নারী ফুটবলারদের সঙ্গে দলে ভেড়ায় মেয়েদের ফুটবল লিগের দল এফসি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। মেয়েদের লিগে সাগরিকা পাল্লা দিয়েছেন দেশের শীর্ষ নারী ফুটবলারদের সঙ্গে। সেবার সাগরিকা গোল করেছিলেন ১০টি। এরপরই মেয়েদের ফুটবলের সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন তাকে নিয়ে আসেন মেয়েদের বয়স ভিত্তিক দলে। সেই থেকে বাংলাদেশের জার্সিতে ফুটবল শুরু সাগরিকার। তার জন্য বাংলাদেশ আজ গর্বিত। এবং নিভৃত পল্লীর সাগরিকা এখন দেশের অন্যতম সেরা নারী ফুটবল তারকা।