ঢাকা ০৭:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঝিনাইগাতী সীমান্তে ১ হাজার ২৩৪ বোতল ভারতীয় মদ ও কাভার্ড ভ্যান আটক তালায় ভ’য়াব’হ সড়ক দু’র্ঘ’টনায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত মাধবপুরে সড়ক দু/র্ঘ/টনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত কিশোরগঞ্জে চালবোঝাই পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিহত রাজশাহীর সিটি হাট ঘিরে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির অভিযোগ গোমস্তাপুরে মহানন্দা নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার বাগাতিপাড়ায় গৃহবধূকে সং/ঘব/দ্ধ ধ/র্ষ/ণে/র অভিযোগ, থানায় মামলা পুঠিয়ার পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগে প্রশাসনের অভিযান টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক খাদে উ/ল্টে নিহত ১৫, আহত অন্তত ১০ সিংড়ায় চোরের কাছ থেকে ফ্রিজ কেনার অভিযোগ এসআইয়ের বিরুদ্ধে

রাজশাহীতে ধানের জমিতে পানি নেই, শ্যালোমেশিন নিয়েই পাম্পে ছুটছেন কৃষকরা

এম এম মামুন:
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৬০ বার পড়া হয়েছে

collected

চ্যানেল এ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজশাহীতে ধানের জমিতে পানি নেই, শ্যালোমেশিন নিয়েই পাম্পে ছুটছেন কৃষকরা

ডিজেল সংকটে ব্যাহত বোরো সেচ, ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় চাষিরা

ডিজেল সংকটে কৃষিকাজ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর কৃষকরা। সময়মতো সেচের পানি না পাওয়ায় বোরো ধান উৎপাদনে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংকট আরও তীব্র হয়েছে কৃষকদের বোতল বা জারকিনে ডিজেল বিক্রি না করায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে শ্যালোমেশিন কাঁধে বা মাথায় নিয়ে ফিলিং স্টেশনে ছুটছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, বোরো মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোতলে তেল না দেওয়ায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু জমিতে পানি দেওয়ার কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে না, খরচও বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। এমন পরিস্থিতিতে বোরোর ফলন বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটছে চাষিদের।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশনে রোববার শ্যালোমেশিন নিয়ে ডিজেল নিতে আসেন জমেলা বেগম (৬৫)। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তিনি মাত্র ২০০ টাকার ডিজেল পান। তার মতো আরও অনেক কৃষক সেচযন্ত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল তেল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।

পবার মাধপুর কুঠিপাড়ার বাসিন্দা জমেলা বেগম জানান, তার তিন মেয়ে, স্বামী নেই। নিজে ও শ্রমিক নিয়ে তিনি বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু গত ১০ দিন ধরে ডিজেলের অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আগের বছর তিন দিন পরপর পানি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর ১০ দিন হলো জমিতে সেচ দিতে পারিনি। কয়েকদিন এই পাম্পে এসে ঘুরে গেছি। আজ এসে মাত্র ২০০ টাকার তেল পেলাম।”

মাথায় করে শ্যালোমেশিন নিয়ে ফিলিং স্টেশনে আসেন কৃষক রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, “এই পাম্প থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেলে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। অথচ আমার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। তেল যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে কিনে সেচ দিতে হচ্ছে। অন্তত ৪০০-৫০০ টাকার তেল দিলে কিছুটা সুবিধা হতো।”

রুচিতা ফিলিং স্টেশনের কয়েকজন কর্মী জানান, যারা সেচ মেশিন নিয়ে আসছেন, তাদেরকে তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে সীমাবদ্ধতা থাকায় নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে সবাই কিছুটা হলেও পায়। তারা বলেন, এদিন ১৭ থেকে ২০ জন কৃষককে পর্যায়ক্রমে ডিজেল দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন, মাইক্রোবাস ও কারেও জ্বালানি সরবরাহ করতে দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা শেষে শুকনো মৌসুমে বোরো ধান চাষে সবচেয়ে বেশি সেচ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক জমিগুলোতে বোরো চাষ অনেকটাই নির্ভরশীল ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ও গভীর নলকূপের ওপর। রাজশাহী অঞ্চলে সেচের বড় একটি অংশ আসে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ এবং ইঞ্জিনচালিত সেচযন্ত্র থেকে। তবে তুলনামূলকভাবে দুই-তৃতীয়াংশ জমিতে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

এ অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ায় কৃষকরা ইচ্ছেমতো ডিজেল কিনতে পারছেন না। শুধু ফিলিং স্টেশন নয়, গ্রামগঞ্জের খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতেও আগের মতো স্বাভাবিকভাবে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষককে দূর-দূরান্তে ঘুরে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তবে সেখানেও চাহিদামতো সরবরাহ মিলছে না।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমে ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বোরো চাষ হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা। সময়মতো পানি না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বোরো মৌসুমে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধানের কুশি গঠন ও শীষ বের হওয়ার সময় পানির ঘাটতি হলে ফলনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। রাজশাহী অঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

নগরীর বুধপাড়া এলাকায় পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন কৃষক আক্কাস আলী। তিনি জানান, “ফিলিং স্টেশনে প্রতি লিটার ডিজেল ১০১ টাকা, কিন্তু বাইরে কিনতে গেলে ১৪০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। পাঁচ বিঘা জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। স্বাভাবিক সময়ে তিন থেকে চার দিন পরপর পানি দেওয়া হয়। কিন্তু এখন ১০ দিন পর পানি দিতে হচ্ছে—শুধু তেল না পাওয়ার কারণে।”

তিনি আরও বলেন, “টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেভাবেই হোক সেচ দিতেই হবে। ধান আর এক মাসের মধ্যে কাটা পড়বে। এখন জমি ফেলে রাখা সম্ভব না। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এবার তেলের কারণে খরচ আরও বাড়বে।”

গত শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মচমইল বাজারে সোহেল ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষককে শ্যালোমেশিন মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভূঞা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক ঘটনাস্থলে যান। তাদের নির্দেশে অপেক্ষমাণ কৃষকদের শ্যালোমেশিনের ট্যাংক ভরে ডিজেল দেওয়া হয়।

এ সময় বাগমারা উপজেলার দ্বীপপুর ইউনিয়নের নানসর গ্রামের কৃষক ইসলাম সরদার জানান, তিনি ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ডিজেল না পাওয়ায় তার সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে। এতে সেচের অভাবে তার ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ডিজেল পেয়ে তিনি কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেন।

এছাড়াও বাগমারা, মোহনপুর, পবা ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বোরো চাষিদের শ্যালোমেশিন নিয়ে তেল নিতে আসতে দেখা গেছে। বালানগর ও কালচিকার কৃষক কালাম ও কোরবান আলী বলেন, “পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়ির পানি তোলার মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। আবার কখনো পাইপ বিছানোর পর দেখা যায় বিদ্যুৎ নেই। এই অবস্থায় সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফলনে মারাত্মক ক্ষতি হবে।”

তারা আরও বলেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো মাঠে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থার ওপরও।

এদিকে রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। মাঝেমধ্যে কালবৈশাখীর বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও গত কয়েকদিনে আবারও তাপমাত্রা বেড়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, “এটাকে পুরোপুরি সংকট না বলে ডে-টু-ডে সিচুয়েশন বলা যায়। আমরা বিষয়টি অবজার্ভ করছি এবং যেন বোরো চাষে সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।”

কৃষকদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, “যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেখানে সেচ কার্যক্রম চলছে। তবে কৃষকদের যেন ফুয়েল পেতে সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। পাম্প মালিকদেরও বলা হচ্ছে, কৃষকদের যেন তেলের সমস্যায় না পড়তে হয়।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

রাজশাহীতে ধানের জমিতে পানি নেই, শ্যালোমেশিন নিয়েই পাম্পে ছুটছেন কৃষকরা

আপডেট সময় : ০৯:০৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

রাজশাহীতে ধানের জমিতে পানি নেই, শ্যালোমেশিন নিয়েই পাম্পে ছুটছেন কৃষকরা

ডিজেল সংকটে ব্যাহত বোরো সেচ, ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় চাষিরা

ডিজেল সংকটে কৃষিকাজ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর কৃষকরা। সময়মতো সেচের পানি না পাওয়ায় বোরো ধান উৎপাদনে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংকট আরও তীব্র হয়েছে কৃষকদের বোতল বা জারকিনে ডিজেল বিক্রি না করায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে শ্যালোমেশিন কাঁধে বা মাথায় নিয়ে ফিলিং স্টেশনে ছুটছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, বোরো মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বোতলে তেল না দেওয়ায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে শুধু জমিতে পানি দেওয়ার কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে না, খরচও বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। এমন পরিস্থিতিতে বোরোর ফলন বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটছে চাষিদের।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশনে রোববার শ্যালোমেশিন নিয়ে ডিজেল নিতে আসেন জমেলা বেগম (৬৫)। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তিনি মাত্র ২০০ টাকার ডিজেল পান। তার মতো আরও অনেক কৃষক সেচযন্ত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল তেল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন।

পবার মাধপুর কুঠিপাড়ার বাসিন্দা জমেলা বেগম জানান, তার তিন মেয়ে, স্বামী নেই। নিজে ও শ্রমিক নিয়ে তিনি বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু গত ১০ দিন ধরে ডিজেলের অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আগের বছর তিন দিন পরপর পানি দিয়েছি। কিন্তু এ বছর ১০ দিন হলো জমিতে সেচ দিতে পারিনি। কয়েকদিন এই পাম্পে এসে ঘুরে গেছি। আজ এসে মাত্র ২০০ টাকার তেল পেলাম।”

মাথায় করে শ্যালোমেশিন নিয়ে ফিলিং স্টেশনে আসেন কৃষক রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, “এই পাম্প থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এই তেলে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। অথচ আমার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। তেল যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে কিনে সেচ দিতে হচ্ছে। অন্তত ৪০০-৫০০ টাকার তেল দিলে কিছুটা সুবিধা হতো।”

রুচিতা ফিলিং স্টেশনের কয়েকজন কর্মী জানান, যারা সেচ মেশিন নিয়ে আসছেন, তাদেরকে তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে সীমাবদ্ধতা থাকায় নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে সবাই কিছুটা হলেও পায়। তারা বলেন, এদিন ১৭ থেকে ২০ জন কৃষককে পর্যায়ক্রমে ডিজেল দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন, মাইক্রোবাস ও কারেও জ্বালানি সরবরাহ করতে দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ষা শেষে শুকনো মৌসুমে বোরো ধান চাষে সবচেয়ে বেশি সেচ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক জমিগুলোতে বোরো চাষ অনেকটাই নির্ভরশীল ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ও গভীর নলকূপের ওপর। রাজশাহী অঞ্চলে সেচের বড় একটি অংশ আসে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ এবং ইঞ্জিনচালিত সেচযন্ত্র থেকে। তবে তুলনামূলকভাবে দুই-তৃতীয়াংশ জমিতে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

এ অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ায় কৃষকরা ইচ্ছেমতো ডিজেল কিনতে পারছেন না। শুধু ফিলিং স্টেশন নয়, গ্রামগঞ্জের খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতেও আগের মতো স্বাভাবিকভাবে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষককে দূর-দূরান্তে ঘুরে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তবে সেখানেও চাহিদামতো সরবরাহ মিলছে না।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমে ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী জেলাতেই ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বোরো চাষ হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা। সময়মতো পানি না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বোরো মৌসুমে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধানের কুশি গঠন ও শীষ বের হওয়ার সময় পানির ঘাটতি হলে ফলনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। রাজশাহী অঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

নগরীর বুধপাড়া এলাকায় পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন কৃষক আক্কাস আলী। তিনি জানান, “ফিলিং স্টেশনে প্রতি লিটার ডিজেল ১০১ টাকা, কিন্তু বাইরে কিনতে গেলে ১৪০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। পাঁচ বিঘা জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। স্বাভাবিক সময়ে তিন থেকে চার দিন পরপর পানি দেওয়া হয়। কিন্তু এখন ১০ দিন পর পানি দিতে হচ্ছে—শুধু তেল না পাওয়ার কারণে।”

তিনি আরও বলেন, “টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেভাবেই হোক সেচ দিতেই হবে। ধান আর এক মাসের মধ্যে কাটা পড়বে। এখন জমি ফেলে রাখা সম্ভব না। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এবার তেলের কারণে খরচ আরও বাড়বে।”

গত শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মচমইল বাজারে সোহেল ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষককে শ্যালোমেশিন মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভূঞা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক ঘটনাস্থলে যান। তাদের নির্দেশে অপেক্ষমাণ কৃষকদের শ্যালোমেশিনের ট্যাংক ভরে ডিজেল দেওয়া হয়।

এ সময় বাগমারা উপজেলার দ্বীপপুর ইউনিয়নের নানসর গ্রামের কৃষক ইসলাম সরদার জানান, তিনি ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ডিজেল না পাওয়ায় তার সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে। এতে সেচের অভাবে তার ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ডিজেল পেয়ে তিনি কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেন।

এছাড়াও বাগমারা, মোহনপুর, পবা ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বোরো চাষিদের শ্যালোমেশিন নিয়ে তেল নিতে আসতে দেখা গেছে। বালানগর ও কালচিকার কৃষক কালাম ও কোরবান আলী বলেন, “পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়ির পানি তোলার মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। আবার কখনো পাইপ বিছানোর পর দেখা যায় বিদ্যুৎ নেই। এই অবস্থায় সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ফলনে মারাত্মক ক্ষতি হবে।”

তারা আরও বলেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো মাঠে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থার ওপরও।

এদিকে রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। মাঝেমধ্যে কালবৈশাখীর বৃষ্টিতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও গত কয়েকদিনে আবারও তাপমাত্রা বেড়েছে। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, “এটাকে পুরোপুরি সংকট না বলে ডে-টু-ডে সিচুয়েশন বলা যায়। আমরা বিষয়টি অবজার্ভ করছি এবং যেন বোরো চাষে সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।”

কৃষকদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, “যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেখানে সেচ কার্যক্রম চলছে। তবে কৃষকদের যেন ফুয়েল পেতে সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। পাম্প মালিকদেরও বলা হচ্ছে, কৃষকদের যেন তেলের সমস্যায় না পড়তে হয়।”