বিলুপ্তির পথে স্বাধীনতার আগের রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প
- আপডেট সময় : ১০:০৫:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬ ৬৩ বার পড়া হয়েছে

বিলুপ্তির পথে স্বাধীনতার আগের রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প
একসময় রাজশাহী মহানগরীর হোসনিগঞ্জের শেখপাড়া ছিল বেতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। স্বাধীনতারও আগে এখানে গড়ে ওঠে ‘বেতপট্টি’। সারি সারি দোকানে তৈরি হতো দৃষ্টিনন্দন বেতের চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি, ট্রে, দোলনা, আয়নার ফ্রেমসহ নানা ধরনের শৌখিন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কারিগরদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি এসব পণ্যের কদর ছিল রাজশাহীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও।
কালের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক আসবাবপত্রের দাপট, কাঁচামালের সংকট, দক্ষ কারিগরের অভাব এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতিতে বিলুপ্তির পথে রাজশাহীর বহু পুরোনো এই কুটিরশিল্প।
জানা যায়, স্বাধীনতারও আগে সিলেট থেকে একদল দক্ষ কারিগর রাজশাহীতে এসে শেখপাড়ায় গড়ে তোলেন বেতপট্টি। তাঁদের হাত ধরেই রাজশাহীতে বেতশিল্পের বিকাশ ঘটে। ধীরে ধীরে স্থানীয়রাও এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হন। একসময় নগরীর হোসনিগঞ্জ এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি দোকানে বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হতো। নববধূদের বিয়ের উপহার হিসেবে বেতের ট্রে, ঝুড়ি কিংবা চেয়ার দেওয়া ছিল সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ।
সেই সময়ের জীবন্ত সাক্ষী এখন ৭০ বছর ধরে এই পেশায় থাকা প্রবীণ কারিগর ও ব্যবসায়ী ফরিদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রায় সাত দশক আগে সিলেট থেকে রাজশাহীতে এসে বেতের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে সমসাময়িকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র জীবিত, যিনি এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
ফরিদুর রহমানের জীবনসংগ্রামও কম নয়। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে এবং ১৫ বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের হাত ধরে রাজশাহীতে চলে আসেন। এরপর আর ফেরা হয়নি সিলেটের কাজীবাজারের পৈতৃক ভিটায়। রাজশাহীতেই গড়ে তোলেন সংসার, ব্যবসা এবং জীবনের নতুন ঠিকানা।
নগরীর শেখপাড়ার সরু গলিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে তাঁর দোকান। চারদিকে সাজানো বেতের চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি, দোলনা, আয়নার ফ্রেম ও বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী। বয়সের ভারে এখন আর নিজ হাতে কাজ করতে পারেন না। তবে প্রতিদিন দোকানে বসে কারিগরদের পরামর্শ দেন এবং আগের দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন।
ফরিদুর রহমান জানান, দেশের বাড়িতেই বেতের কাজ শেখেন তিনি। রাজশাহীতে এসে সেই দক্ষতাকেই পুঁজি করে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমদিকে তৎকালীন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ক্যাডেট কলেজের বিভিন্ন কাজের অর্ডার পান। একসময় তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতেন এবং নগরীর বিভিন্ন স্থানে একাধিক দোকান ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সবকিছু। বর্তমানে হোসনিগঞ্জের বেতপট্টিতে টিকে আছে মাত্র তিনটি দোকান, যার একটি তাঁর।
ফরিদুর রহমান শুধু একজন কারিগর নন, একজন উদ্ভাবকও। তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে ভয়াবহ বন্যায় বেতের সংকট দেখা দিলে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন একদিন একটি চায়ের দোকানে ঝুলতে থাকা প্লাস্টিকের সরু ফিতা দেখে তাঁর মাথায় নতুন ভাবনা আসে। পাকিস্তানের করাচি থেকে প্লাস্টিকের সুতা এনে তিনি শুরু করেন প্লাস্টিক বোনা আসবাব তৈরির কাজ। প্রথমে অনেকে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও পরে তাঁর সেই উদ্যোগই সফল হয়। পরবর্তীতে রাজশাহীর অনেক ব্যবসায়ীও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
তবে বর্তমানে প্লাস্টিক, স্টিল ও আধুনিক আসবাবপত্রের প্রসারে বেতের পণ্যের চাহিদা অনেক কমে গেছে। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। ফরিদুর রহমানের নিজের ছেলেরাও এই ব্যবসার দায়িত্ব নিতে চাননি।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “একটি শিল্প শুধু কারিগরের হাতে বাঁচে না, প্রয়োজন উত্তরসূরি, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা। আমি না থাকলে হয়তো এই দোকানের দরজাও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। সহজ শর্তে ঋণ, দক্ষ কারিগর তৈরির প্রশিক্ষণ, আধুনিক নকশা উন্নয়ন এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় ও আঞ্চলিক হস্তশিল্প মেলা এবং প্রদর্শনীতে হোসনিগঞ্জের বেতপণ্যের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা হলে এই হারিয়ে যেতে বসা শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
একসময় যে বেতপট্টির কোলাহলে মুখর থাকত শেখপাড়া, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। তবু সেই নীরবতার মাঝেই প্রতিদিন দোকানের সামনে বসে থাকেন প্রবীণ কারিগর ফরিদুর রহমান—রাজশাহীর হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের শেষ প্রহরী হয়ে।



















