বাগাতিপাড়ায় পাওয়ার টিলারের বকেয়া আদায়ে মাইকিং করে ‘হালখাতা’
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬৮ বার পড়া হয়েছে

বাগাতিপাড়ায় পাওয়ার টিলারের বকেয়া আদায়ে মাইকিং করে ‘হালখাতা’
বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধিঃ
নাটোরের বাগাতিপাড়ায় পাওয়ার টিলারের বকেয়া আদায়ে মাইকিং করে ‘হালখাতার আয়োজন করেছেন মেহেদী হাসান নামের এক ব্যক্তি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার ফাঁগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের সাইলকোনা নওদাপাড়া গ্রামে গিয়ে শোনা যায় এই মাইকিংয়ের শব্দ। মাইকের রেকর্ডিংয়ে বাজছে, “সম্মানিত এলাকাবাসী, আসসালামু আলাইকুম। শুভ হালখাতা, শুভ হালখাতা। সাইলকোনা গ্রামের হাসান ভাইয়ের টিলারের শুভ হালখাতা। আজই হাসান ভাইয়ের বাড়িতে টিলারের হালখাতা। উক্ত হালখাতায় আপনাদের উপস্থিতি একান্তভাবে কামনা করছি।”
গ্রামের পথে এমন মাইকিং সচরাচর শোনা যায় না। তবে পাওয়ার টিলারে জমি চাষের বকেয়া টাকা আদায়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন মেহেদী হাসান। বকেয়া টাকা পরিশোধের কথা কৃষকদের মনে করিয়ে দিতে এবার সাতটি গ্রামে মাইকিং করে আয়োজন করেছেন ‘হালখাতা’র।
মেহেদী হাসান সাইলকোনা নওদাপাড়া গ্রামের মৃত সানাউল্লাহ হক ওরফে সানুর ছেলে।
মেহেদী হাসানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দায় টেবিল পেতে বকেয়া টাকা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর বাড়ির একটি আমগাছের মগডালে বাঁধা হয়েছে মাইক। সেখান থেকেই বারবার দেওয়া হচ্ছে হালখাতায় আসার আমন্ত্রণ।
বাড়ির ভেতরে আবার প্রস্তুত করা হচ্ছে মিষ্টির প্যাকেট। বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে কেউ এলেই তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মিষ্টি। প্রচলিত হালখাতার সঙ্গে এ ধরনের মাইকিংয়ের আয়োজন স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি করেছে কৌতূহল।
মেহেদী হাসান পেশায় পাওয়ার টিলার চালক। এইচএসসি পাস করেও চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার কৃষিপেশাকেই জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। সাইলকোনা ছাড়াও আশপাশের ভূইয়াপাড়া, নওপাড়া, সাতশইল, মাধববাড়িয়া, বাসুপাড়া ও কুমারপাড়াসহ প্রায় সাতটি গ্রামের কৃষকের জমি পাওয়ার টিলারে চাষ করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, কৃষকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে অনেক সময় বাকিতে জমি চাষ করে দেন মেহেদী। ফসল ঘরে তোলার পর কিংবা সুবিধামতো সময়ে কৃষকেরা সেই টাকা পরিশোধ করেন। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেকের বকেয়া জমতে থাকে।
মেহেদী হাসানের পরিবারে অবশ্য বকেয়া আদায়ে হালখাতা আয়োজনের ইতিহাস নতুন নয়। প্রায় ২০০০ সালের দিকে তাঁর বাবা কৃষকদের বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য ব্যতিক্রমীভাবে হালখাতা চালু করেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই রীতি ধরে রেখেছেন মেহেদী। প্রতি বছরই আয়োজন করেন হালখাতার।
চলতি বছরের জুলাই মাসে নিয়ম মেনে হালখাতার আয়োজন করেছিলেন তিনি। তখন কৃষকদের কাছে তাঁর পাওনা ছিল ২ লাখ ২২ হাজার টাকা। তবে সেবার হালখাতায় আদায় হয় ৫৩ হাজার টাকা। পরে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অনেকে জানান, হালখাতার বিষয়টি তাঁদের মনে ছিল না।
এর মধ্যে বকেয়া টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ টাকা। ফলে আবারও হালখাতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন মেহেদী। এবার শুধু নিমন্ত্রণপত্র বা কার্ড দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বকেয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে আশপাশের সাতটি গ্রামে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
হালখাতায় বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে আসা আব্দুল আজিজ ও জয়নাল আবেদিন বলেন, হাসানের কাছ থেকে আমাদের জমি চাষ করাই। অনেক সময় হাতে টাকা থাকে না। তাই বকেয়া থেকে যায়। হালখাতায় এসে টাকা পরিশোধ করে দিই। এবার মাইকিং করে জানানোয় হালখাতার দিনটির কথা সবার মনে থাকবে।
মেহেদী হাসান বলেন, আমার বাবা কৃষিকাজ করতেন। তাঁর কাছ থেকেই কৃষকদের সঙ্গে এভাবে কাজ করার বিষয়টি শিখেছি। চাষের সময় কৃষকেরা যাতে টাকার সংকটে না পড়েন, সে জন্য অনেক সময় বাকিতে জমি চাষ করে দিই।
তিনি বলেন, বকেয়া টাকা জমতে জমতে একসময় বড় অঙ্ক হয়ে যায়। অনেকে সময়মতো দিতে পারেন না, আবার অনেকে হালখাতার কথাও মনে রাখেন না। তাই এবার কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি সাতটি গ্রামে মাইকিং করেছি, যাতে সবাই দিন-তারিখটি মনে রাখতে পারেন।
কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন পাওয়ার টিলার চালকের বকেয়া আদায়ে এমন ব্যতিক্রমী হালখাতার আয়োজন স্থানীয়দের মধ্যে যেমন আগ্রহ তৈরি করেছে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনৈতিক লেনদেনের পুরোনো এই রীতিকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে।



















