রাজশাহীতে পেঁয়াজের বাজারে নজিরবিহীন দরপতন, চরম সংকটে কৃষক
- আপডেট সময় : ০৪:১৫:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ ৫২ বার পড়া হয়েছে

রাজশাহীতে পেঁয়াজের বাজারে নজিরবিহীন দরপতন, চরম সংকটে কৃষক
উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম চাষিরা; অতিরিক্ত সরবরাহ, সংরক্ষণ সংকট ও আমদানিকে দায়
রাজশাহীতে পেঁয়াজের বাজারে নজিরবিহীন দরপতনে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে হাজার হাজার চাষিকে। সংরক্ষণে পচন, ওজন কমে যাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ—সব মিলিয়ে হতাশার ছায়া নেমে এসেছে পেঁয়াজচাষিদের মধ্যে।
রাজশাহীতে এবার রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তবে ভালো ফলনের সুফল পাচ্ছেন না কৃষকেরা। চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই বাজারে দাম কম থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আগামজাত বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ। এ মৌসুমে মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন এবং মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, অন্যান্য বছর এই সময়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে জাতভেদে দাম নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। ফলে প্রতি মণে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন তারা।
চাষিরা জানান, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার কারণে অনেক পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমে যাচ্ছে। আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ পচেও নষ্ট হচ্ছে। বাজারে ওজন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় তোলা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আব্দুল মমিন বলেন, “এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন মাত্র এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায়। সংসারের সবজি কিনতেও আরও এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। গত ২০ বছরে এমন দাম দেখিনি।”
পবার কৃষক শুকুর মোহম্মদ বলেন, “এবার পেঁয়াজে বড় লোকসান হবে। আগেরবার কিছু লাভ হয়েছিল। কিন্তু এবার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হবে। বাজারে কোনো দাম নেই।”
কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব জমিতে প্রতি বিঘা পেঁয়াজ চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আর লিজ নেওয়া জমিতে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। শুধু জমির ভাড়াই বিঘাপ্রতি প্রায় ৩৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহই দরপতনের প্রধান কারণ। পেঁয়াজ ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম বলেন, “এবার উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। সংরক্ষণ সমস্যা থাকায় কৃষকেরা একসঙ্গে বাজারে পেঁয়াজ আনছেন। মোকামে আমরা বেশি দামে বিক্রি করতে না পারলে বেশি দামে কিনব কীভাবে?”
চাষিদের একটি অংশ মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজ আমদানিকেও দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, দেশীয় মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে ওঠার সময় আমদানিকৃত পেঁয়াজ প্রবেশ করায় স্থানীয় উৎপাদন ন্যায্যমূল্য পায়নি।
পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার বলেন, “বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের জোগান বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। অনেক কৃষক পচনের আশঙ্কায় দ্রুত বিক্রি করছেন। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই এই দরপতন। তবে কিছুদিন পর দাম বাড়তে পারে বলে আশা করছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পরিচর্যা শাখার পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, “পেঁয়াজ সারা বছর খাওয়া হলেও সবাই একসঙ্গে বিক্রি করতে গেলে বাজারদর কমে যায়। তাই ফসল কাটার পরপরই উৎপাদন খরচ উঠে আসার আশা করা ঠিক নয়।”
এদিকে কৃষকদের দাবি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজারে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।


















