পুঠিয়ায় তিন ফসলি জমিতে পুকুর খননের হিড়িক, কমছে আবাদি জমি
- আপডেট সময় : ০৮:৫২:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ ৫৪ বার পড়া হয়েছে

পুঠিয়ায় তিন ফসলি জমিতে পুকুর খননের হিড়িক, কমছে আবাদি জমি
রাজশাহীর পুঠিয়ায় তিন ফসলি উর্বর কৃষিজমিতে অবাধে পুকুর খননের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। অধিক লাভের আশায় মাছ চাষের জন্য কৃষিজমি কেটে পুকুর তৈরির কারণে প্রতিবছর আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় সব এলাকাতেই পুকুর খননের প্রবণতা দেখা গেলেও জিউপাড়া, ভালুকগাছি ও শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন বিল এলাকায় চলছে ব্যাপক পুকুর খনন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রায় এক দশক আগে শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের কিছু নিচু ও এক ফসলি জমিতে মাছ চাষের জন্য পুকুর খনন শুরু হলেও বর্তমানে তা ছড়িয়ে পড়েছে তিন ফসলি উর্বর জমিতেও। এক্সকাভেটর দিয়ে জমি কেটে পুকুর তৈরির ফলে প্রতিবছর কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে কৃষিজমি হ্রাস পেতে থাকলে ভবিষ্যতে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। পুঠিয়া একটি কৃষিপ্রধান উপজেলা। এখানে ধান, পাট, আখ, আলু, বেগুন, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু কৃষিজমির ক্ষতিই নয়, পুকুরের মাটি বহনকারী ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহনের কারণে সড়ক ও মহাসড়কেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকেরা ট্রাক্টর চালাচ্ছে, যাদের অধিকাংশেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই।
শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মমিনুল হক বলেন, “সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। এমনকি জিউপাড়া এলাকায় আমবাগান কেটেও পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। এসব পুকুরের মাটি স্থানীয় ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার অনেকে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে মাটি কিনেও নিচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “পুকুর খননের ফলে উপজেলার কয়েকটি বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের জমি পুকুর খননের জন্য ছেড়ে দিচ্ছেন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজর এড়াতে বর্তমানে দিনের পরিবর্তে রাতের আঁধারে অধিকাংশ পুকুর খননের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এতে কৃষিজমি রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী কৃষিজমি কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। তবে ঠিক কতটুকু জমি কমেছে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।”
এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান বলেন, “পুকুর খননের খবর পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। পুকুর খননে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি এক্সকাভেটরও জব্দ ও অকেজো করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মূলত মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র কৃষকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পুকুর খননে উৎসাহিত করছে। বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।”
স্থানীয় কৃষক, পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে পুঠিয়ার কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য ও খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।


















