বাগাতিপাড়ার পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিচে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা; ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি
- আপডেট সময় : ০৭:০৩:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬ ১১২ বার পড়া হয়েছে

বাগাতিপাড়ার পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের নিচে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা; ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি
যেখানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা, সেই ভবনের নিচেই গড়ে উঠেছে মশার প্রজনন কেন্দ্র। সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানি জমে থাকে, আর পুরো বর্ষাজুড়ে সেই পানি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনের নিচের অংশে বছরের পর বছর ধরে এমন চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে প্রতিনিয়ত মশার বংশবিস্তার ঘটছে এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগী, তাদের স্বজন, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনের নিচের অংশে বর্ষার পানি জমে রয়েছে। জমে থাকা পানিতে অসংখ্য মশার লার্ভা ও ডিম ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, এই স্থান থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন মশার জন্ম হচ্ছে। ভবনের নিচে জমে থাকা পানির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা পুরো পরিবেশকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভবনের পেছনে স্থাপিত একটি টিউবওয়েলের অতিরিক্ত পানি নিয়মিত ভবনের নিচে গিয়ে জমে। পাশাপাশি অনেকেই ওই টিউবওয়েলের পাশে থালাবাসন ধোয়ার কারণে ময়লাযুক্ত পানিও সেখানে ফেলেন। এছাড়া খাবারের উচ্ছিষ্ট, ফলের খোসা, পলিথিন, বিভিন্ন প্যাকেট এবং রোগীদের ব্যবহৃত নোংরা সামগ্রীও সেখানে ফেলা হয়। ফলে পানি ও বর্জ্যের সমন্বয়ে জায়গাটি মশার বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি নতুন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকেই প্রায় চার বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ভবনের নিচে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। সারা বছরই সেখানে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা জমে ছোটখাটো ভাগাড়ের চিত্র দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বছরখানেক আগে ভবনের পেছনে টিউবওয়েল স্থাপনের পর ব্যবহৃত ও নোংরা পানিও সেখানে জমতে শুরু করে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় এবং বর্ষা মৌসুমজুড়ে তা আর সরে না। মাঝে মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন ঘোরলাজ মহল্লার বাসিন্দা আল মামুন বলেন, যে অফিস থেকে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়, সেই অফিসের নিচেই যদি মশার প্রজনন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিবার পরিকল্পনা ভবনের সামনে চায়ের দোকানদার রুবেল আলী বলেন, অনেক বছর ধরেই সামান্য বর্ষাতেই এখানে পানি জমে। রোগীর স্বজনরাও সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। এতে মশার বংশবিস্তার বাড়ছে এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
উপজেলার মাড়িয়া এলাকা থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী সামসুল ইসলাম বলেন, এখানে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে মশার যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। রোগীদের স্বার্থে দ্রুত পানি অপসারণ ও মশা নিধনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
রোগীর স্বজন তৌফিকুর রহমান বলেন, দিনের বেলাতেও এখানে প্রচুর মশা দেখা যায়। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে যদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটি খুবই উদ্বেগজনক।
উপজেলা পরিষদ চত্বরে বসবাসকারী ওয়াসীম আলী বলেন, ভবনের নিচে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব অসহনীয় হয়ে ওঠে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
উল্লেখ্য, গত ৬ জুন একই ভবনের সামনেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জমে থাকা পানি অপসারণ ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। অথচ একই ভবনের নিচেই দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে মশার বংশবিস্তার চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে-যেখানে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়, সেখানে নিজেদের দপ্তরের এমন অবস্থা কেন।
এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ জামিউর রহমান বলেন, আমি প্রায় দুই বছর আগে এখানে যোগদান করেছি। তবে তারও আগে থেকেই ভবনের নিচে পানি ও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকছে। নিজ উদ্যোগে কয়েকবার পরিষ্কার করেছি এবং বিষয়টি উপজেলা পরিষদের সভায়ও জানিয়েছি। এবার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি ভবনের নিচের অংশ ভরাটের জন্য দাপ্তরিকভাবে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে এবং সেখানে ময়লা না ফেলার জন্য সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজুয়ানুল হক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ভবনের নিচে জমে থাকা পানি অপসারণের বিষয়টি আগেও উপজেলা পরিষদকে জানানো হয়েছিল। আবারও লিখিতভাবে জানানো হবে।
বাগাতিপারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেবাশীষ বসাক বলেন, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর লিখিতভাবে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।













