লিবিয়ার বন্দিশালায় এক টুকরো রুটির হাহাকার, সাগরেই সলিল সমাধি জগন্নাথপুরের নাঈমের
- আপডেট সময় : ০৭:০৯:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬ ১১৬ বার পড়া হয়েছে

লিবিয়ার বন্দিশালায় এক টুকরো রুটির হাহাকার, সাগরেই সলিল সমাধি জগন্নাথপুরের নাঈমের
ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে ১৭ লাখ টাকা খরচ; দালালের নির্যাতন, অনাহার আর ভূমধ্যসাগরে নিথর দেহ ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ
আঠারো মাস বয়সী ছোট্ট অজিহা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, তার মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া চিরতরে সরে গেছে। হয়তো এখনো সে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে বাবা নাঈম মিয়ার ফেরার আশায়। কিন্তু সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া (মাঝপাড়া) গ্রামের ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ এখন আর ফিরবেন না। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে।
নাঈম মিয়া ছিলেন দোলন মিয়া ও আঁখি বেগমের ছোট ছেলে। তিনি স্থানীয়ভাবে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি জগন্নাথপুর পৌরসভার কবিরপুর বাজারের একটি দোকানে কাজ করতেন। কিন্তু সংসারের অভাব ঘোচাতে এবং ভালো জীবনের আশায় গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বাড়ি ছাড়েন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের এক দালাল চক্রের মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রায় ১৭ লাখ টাকা খরচ করে তিনি লিবিয়ায় পৌঁছান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় তার জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর নাঈমসহ আরও কয়েকজনকে একটি অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। তাদের পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হতো না। মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে, ২০ মার্চ, স্ত্রী আয়েশা বেগমের কাছে পাঠানো একটি ভয়েস মেসেজে নাঈম তার দুর্বিষহ অবস্থার বর্ণনা দেন।
ভয়েস মেসেজে তিনি বলেন, “আমরা মারা যাবো… আমাদের কোনো খাবার নেই। পচা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেতে দেয়। সকালে অর্ধেক রুটি আর রাতে অর্ধেক রুটি দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।”
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন অনাহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নির্যাতনের কারণে নাঈম শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরে ২১ মার্চ রাতে তাকে অন্যদের সঙ্গে নৌকায় তুলে ইউরোপের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
একই নৌকায় থাকা এবং পরে গ্রিসে পৌঁছানো তোফায়েল নামের এক ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছেন, দীর্ঘ এক মাসের অনাহার ও নির্যাতন সইতে না পেরে নৌকায় ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই নাঈম মারা যান। এরপর তার মরদেহ মাঝসাগরে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফলে নাঈমের মরদেহটিও আর স্বজনদের কাছে ফিরল না। দেশে ফিরে এল না তার স্বপ্ন, ফিরল না তার নিথর দেহটুকুও।
বর্তমানে নাঈমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তার মা আঁখি বেগম বাকরুদ্ধ, বাবা দোলন মিয়া ও স্ত্রী আয়েশা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে পুরো এলাকার বাতাস।
নাঈমের বাবা দোলন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “দালালের খপ্পরে পড়ে ১৭ লাখ টাকা হারিয়েছি, এখন ছেলেকেও হারালাম। আমার নাতনি এতিম হয়ে গেল।”
স্থানীয়দের দাবি, বিদেশে নেওয়ার নামে প্রতারণা ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে এভাবে সন্তান হারানোর বেদনা বইতে না হয়।










