
বিদায় নিতে চলেছে বাংলা ১৪৩২ সাল। নতুন বছর ১৪৩৩-কে বরণ করতে প্রস্তুত বাঙালি। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। আর এই উৎসবেই আবারও দেখা মিলবে রাজশাহীর শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ‘শখের হাঁড়ি’। তবে সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা এই লোকজ শিল্প এখন টিকে আছে মাত্র একটি পরিবারের হাত ধরে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের কুমোরপাড়ায় গেলে চোখে পড়ে রঙিন এক নীরব উৎসব। উঠোনজুড়ে সারি সারি মাটির হাঁড়ি—হলুদ, লাল, নীল, সাদা রঙের নকশায় সাজানো। মাছ, পাখি, পদ্মফুল আর লোকজ মোটিফে আঁকা এসব হাঁড়ি যেন জীবন্ত এক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। এদেরই বলা হয় ‘শখের হাঁড়ি’।
একসময় রাজশাহীর লোকজ সংস্কৃতিতে শখের হাঁড়ির ছিল বিশেষ গুরুত্ব। বিশেষ করে মেয়ের বিয়েতে মিষ্টি ভরে হাঁড়ি উপহার পাঠানোর রীতি ছিল বেশ প্রচলিত। খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের কাজেও ব্যবহৃত হতো এসব হাঁড়ি। ঘরের চালে পাটের শিকায় ঝুলিয়ে রাখা হতো নানা খাবারভর্তি হাঁড়ি।
তবে প্লাস্টিক, কাচ ও ধাতব পণ্যের সহজলভ্যতায় কমে গেছে এর ব্যবহার। ফলে এক সময়ের সমৃদ্ধ এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে রাজশাহীতে মাত্র একটি পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে—সুশান্ত কুমার পালের পরিবার।
শৈশবে বাবা ভোলানাথ পালের কাছ থেকে হাঁড়ি তৈরির হাতেখড়ি নেন সুশান্ত পাল। নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন স্বর্ণপদকসহ ২৪টি পদক এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন ৩২টি সনদ। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের কারুশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।
তবে সম্মাননা থাকলেও বাস্তবতা কঠিন। সারা বছর বিক্রি কম থাকায় বৈশাখী মেলা, বাণিজ্য মেলা ও লোকজ মেলার ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে হচ্ছে এই শিল্পকে। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় মেলায় কিছুটা চাহিদা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা অনেকটাই কম।
কারিগর মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল বলেন, বৈশাখকে ঘিরেই মূলত কাজের চাপ থাকে। সারা দেশ থেকে ক্রেতারা এসে শখের হাঁড়ি, মাটির পুতুল ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। তবে আগের মতো আর কাজের চাপ নেই।
কারিগর আনন্দ কুমার পাল জানান, আগে অনেক পরিবার এই পেশায় যুক্ত ছিল। এখন কারিগরের সংখ্যা কমে গেছে। চাহিদাও আগের মতো নেই।
স্বর্ণা রাণী দাস বলেন, “আমাদের কাজের তুলনায় পারিশ্রমিক খুবই কম। মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী আয় হয় না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
লোকজ শিল্প নিয়ে গবেষক উদয় সঙ্কর বিশ্বাস বলেন, “শিল্প টিকে থাকে মূলত ক্রেতার ওপর। রাষ্ট্র সহায়তা দিতে পারে, তবে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সমাজ ও মানুষের। নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পের সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে।”
নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে সুশান্ত কুমার পাল বলেন, “নাম-যশ পেয়েছি, কিন্তু সচ্ছলতা পাইনি। করোনা পরবর্তী সময়ে বিক্রি আরও কমে গেছে। এইভাবে চলতে থাকলে শখের হাঁড়ি একদিন হারিয়ে যাবে।”
তিনি আরও জানান, একসময় রাজশাহীতে সাড়ে চার হাজারের বেশি কারিগর এই পোড়ামাটির শিল্পে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে গুটিকয়েক ছাড়া সবাই পেশা বদল করেছেন। তিনটি ঐতিহ্যবাহী ঘরানার মধ্যে এখন টিকে আছে শুধু বসন্তপুর ঘরানা।
প্রধান কারিগর হিসেবে সুশান্ত পালের আশঙ্কা, তার পরবর্তী প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহ না দেখালে হারিয়ে যাবে শত বছরের এই ঐতিহ্য।
প্রধান নির্বাহী পরিচালক: এ, এস, এম, আল-আফতাব খান সুইট
০১৯১১৫০১৩১৪
০১৭৭৬২৩০৮০৮
সম্পাদক: অধ্যক্ষ মো: সাজেদুর রহমান
০১৭১৩৭৪৬৭২৭
ব্যবস্থাপনা পরিচালক: মো: জাকির হোসেন রবিন
০১৮৮০৫৫০৬৫৭
সাব এডিটর: এম এম মামুন
০১৭২৭৬৬৪৫০০
Copyright © 2026 Channel A News. All rights reserved.