
একের পর এক হত্যা, ছিনতাই, গুলিবর্ষণ, বিস্ফোরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধে রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একসময় দেশের অন্যতম শান্ত ও নিরাপদ নগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা আলোচিত অপরাধ জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত পাঁচ মাসে মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, সংঘবদ্ধ হামলা, বিস্ফোরণ, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির একটি জুয়েলার্স দোকানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুটের ঘটনা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে অপরাধের চাপ বাড়তে শুরু করে। জানুয়ারি মাসে রাজশাহী রেঞ্জে এক হাজার ৫৭৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। মহানগর এলাকাতেও হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত অভিযানে মাদক কারবারি, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধ প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী-নওগাঁ ও ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে ধারাবাহিক বাস ডাকাতির ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে নগরীর পদ্মাপাড়ে এক ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা, মাদক ব্যবসার বিস্তার, কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ সংকট এবং পুলিশের জনবল সীমাবদ্ধতা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে সাহেববাজার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল আবাসিক অঞ্চলগুলো অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
গত মার্চে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং জননিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসনের দাবি, অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণ, হামলা ও বড় ধরনের চুরি-ডাকাতির ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
জুন মাসে রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টিতে কারুশ্রী জুয়েলার্সে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। দোকানের দেয়াল কেটে প্রায় ১৫০ ভরি স্বর্ণ, এক হাজার ২০০ ভরি রূপা এবং নগদ ২৫ লাখ টাকা লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন দোকান মালিক তূর্য সরকার। এ ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) রাজশাহীর সব জুয়েলারি দোকান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। তবে ঘটনাটি চুরি নাকি পরিকল্পিত লুট—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে ২১ জুন নগরীর শাহ মখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মীর তারেকের বাসায় ফয়সাল বাঁধন নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। এর দুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে দুটি রেস্তোরাঁয় দেশীয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে হামলার ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যসহ ছয়জন আহত হন।
এদিকে, জেলা বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপে ওই অভিযোগ নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
শুধু মহানগর নয়, জেলার পদ্মার চরাঞ্চলেও অবৈধ বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে চরাঞ্চলে অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই চারজন নিহত হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মার চরকে কেন্দ্র করে অন্তত ১১টি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর মধ্যে কাঁকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনীর নাম উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিস্তার, মহাসড়কে নিরাপত্তা দুর্বলতা, জমি ও সামাজিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমিত সক্ষমতা বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুল কবির বলেন, "অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দিন-রাত পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।"
প্রধান নির্বাহী পরিচালক: এ, এস, এম, আল-আফতাব খান সুইট
০১৯১১৫০১৩১৪
০১৭৭৬২৩০৮০৮
সম্পাদক: অধ্যক্ষ মো: সাজেদুর রহমান
০১৭১৩৭৪৬৭২৭
ব্যবস্থাপনা পরিচালক: মো: জাকির হোসেন রবিন
০১৮৮০৫৫০৬৫৭
সাব এডিটর: এম এম মামুন
০১৭২৭৬৬৪৫০০
Copyright © 2026 Channel A News. All rights reserved.