
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের জগদল গ্রামে, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তঘেঁষা এক নীরব জনপদে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—রাজা শ্রী বীরেন্দ্রনাথের জগদল জমিদারবাড়ি। একসময়কার ঐশ্বর্য আর গৌরবের প্রতীক হলেও অযত্ন ও অবহেলায় আজ এটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
রাণীশংকৈল উপজেলা শহর থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জমিদারবাড়িতে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ। উপজেলা শহর থেকে নেকমরদ চৌরাস্তা পর্যন্ত চার্জার ভ্যান বা অটোতে পৌঁছানো যায় স্বল্প খরচে। এরপর নেকমরদ কলেজ রোড ধরে অটো বা রিজার্ভ ভ্যানে জগদল জমিদারবাড়ি। পথজুড়ে সবুজ ধানক্ষেত, নদীর কলকল ধ্বনি আর সীমান্ত এলাকার নিস্তব্ধতা যেন ইতিহাসের কোনো উপাখ্যানের সূচনা করে।
জগদল গ্রামে রয়েছে তীরনই ও নাগর নদীর মিলনস্থল—স্থানীয়দের ভাষায় ‘দুই নদীর মোহনা’। বাংলাদেশে এমন দ্বৈত নদীর মিলনস্থল খুবই বিরল। জমিদারবাড়ির পাশেই রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প ও একটি প্রাচীন কালীমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যা পুরো এলাকাকে আরও ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছে।
জমিদারবাড়ির স্থাপনাগুলো এখন লতাগুল্ম ও বড় বড় বৃক্ষের আড়ালে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। বসতঘর, মন্দির, সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশ তোরণ এখনও দৃশ্যমান থাকলেও প্রতিটি কাঠামোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইট, চুন, কাঠ ও লোহার বর্গা দিয়ে নির্মিত ভবনগুলোর স্থাপত্যে তুস্কান স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও সমতল ছাদের ব্যবহার উনবিংশ শতাব্দীর জমিদার স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। বাড়ির পশ্চিম পাশে নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জগদলের রাজকুমার শ্রী বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সুপণ্ডিত ও সাহিত্যপ্রেমী। ভারতের বাকীপুরের জমিদার রায় পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। বীরেন্দ্রনাথের গড়ে তোলা সমৃদ্ধ পাঠাগার ১৯৪৮ সালে দান করা হয় তৎকালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (বর্তমান দিনাজপুর সরকারি কলেজ)। সে সময় ওই পাঠাগারের বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা—যা ছিল বিপুল অঙ্ক।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শৈশবের কিছু সময় জগদল জমিদারবাড়িতে কাটিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে ২০১৪ সালে নির্মিত ‘হুমায়ূন মঞ্চ’ বর্তমানে অরক্ষিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
২০২২ সালে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভর দায়ের করা রিটের পর ২০২৪ সালে জগদল জমিদারবাড়িটি সরকারিভাবে গেজেটেড হয়। তবে গেজেট প্রকাশের পরও কোনো সংস্কার বা সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় ভবনের আরও অংশ ভেঙে পড়ছে।
জমিদারবাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে উঠেছে নাগর নদী ভিউ পয়েন্ট। বিকেলের আলো, নদীর ঢেউ ও সীমান্ত পিলারের আলোয় জায়গাটি এখন জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করলেও জমিদারবাড়ির দিকে তেমন নজর নেই।
রাণীশংকৈল উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ জগদল জমিদারবাড়ি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান শুভ বলেন, “আমরা আশা করছি পুরনো এই জমিদারবাড়িটি তার আগের রূপ ফিরে পাবে। এটিকে দর্শনীয় করে তুলতে সরকারের সহযোগিতার বিকল্প নেই।”
স্থানীয়দের মতে, সরকার চাইলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব, যা থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হবে।
প্রধান নির্বাহী পরিচালক: এ, এস, এম, আল-আফতাব খান সুইট
০১৯১১৫০১৩১৪
০১৭৭৬২৩০৮০৮
সম্পাদক: অধ্যক্ষ মো: সাজেদুর রহমান
০১৭১৩৭৪৬৭২৭
ব্যবস্থাপনা পরিচালক: মো: জাকির হোসেন রবিন
০১৮৮০৫৫০৬৫৭
সাব এডিটর: এম এম মামুন
০১৭২৭৬৬৪৫০০
Copyright © 2026 Channel A News. All rights reserved.