রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলায় জনবল সংকটে বন্ধ আইসিইউ, রোগীর তীব্র চাপ রামেক হাসপাতালে
- আপডেট সময় : ০৮:৩১:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১৫ বার পড়া হয়েছে

রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলায় জনবল সংকটে বন্ধ আইসিইউ, রোগীর তীব্র চাপ রামেক হাসপাতালে
শয্যা ও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ চিকিৎসক-নার্সের অভাবে অচল ৬০টির বেশি আইসিইউ বেড; হাম পরিস্থিতিতে বাড়ছে সংকট
জনবল সংকটের কারণে রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলার হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শয্যা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সের অভাবে বহু আইসিইউ দীর্ঘদিন ধরে চালু করা যাচ্ছে না। এর ফলে মুমূর্ষু রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তরিত হতে হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক হাম ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে।
চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকার অভাবই এই সংকটের প্রধান কারণ। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, নওগাঁ ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে কমপক্ষে ৬০টির বেশি আইসিইউ শয্যা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক যন্ত্রপাতিও অচল বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ বেড থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু নয়। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৮টি আইসিইউ বেড জনবল সংকটে পড়ে আছে। একইভাবে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৬টি এবং শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যা দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে ২০২২ সালে ১০টি আইসিইউ বেড ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় আজও তা চালু করা যায়নি। ফলে গুরুতর রোগীদের শেষ পর্যন্ত রাজশাহীতে রেফার করতে হচ্ছে।
বর্তমানে রামেক হাসপাতালের ৪০ শয্যার আইসিইউ-ই এই অঞ্চলের গুরুতর রোগীদের প্রধান ভরসা। তবে হাসপাতালটির এই আইসিইউও পূর্ণাঙ্গ সরকারি অনুমোদন ছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী যেখানে কমপক্ষে ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন, সেখানে রয়েছে মাত্র একজন—এমন তথ্যও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। ফলে প্রেষণে আনা জনবল, স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স এবং শিক্ষানবিশদের সহায়তায় কোনোরকমে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
এদিকে, রাজশাহীতে হাম পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আইসিইউর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। রামেক হাসপাতাল সম্প্রতি শিশুদের জন্য আইসিইউ বেড ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করেছে। এর মধ্যে ১২টি বেড হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং ৬টি অন্য শিশু রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে আইসিইউর চাপ কমাতে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, রাজশাহীর ১০টি আইসিইউ বেড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবুও প্রতিদিন অনেক রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকছেন বলে জানা গেছে।
রোগীর স্বজনরা বলছেন, জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ থাকলেও চালু না থাকায় রোগী নিয়ে রাজশাহীতে ছুটতে হচ্ছে, যা অনেক সময় রোগীর অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে। বিশেষ করে হার্টের রোগী, শ্বাসকষ্টের রোগী এবং গুরুতর শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। তাদের অভিযোগ, জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো তৈরি হলেও জনবল না থাকায় সেই সুবিধা জনগণ পাচ্ছে না।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেছেন, আইসিইউ চালানোর জন্য অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট অথবা ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স প্রয়োজন। এ ধরনের জনবলে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
অন্যদিকে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদুল ইসলাম বলেছেন, আশপাশের জেলাগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী রামেকে আসেন। অনেক রোগী একেবারে সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছান। তখন তাদের আইসিইউ প্রয়োজন হলেও শয্যা সীমিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করানো সম্ভব হয় না। ফলে দ্রুত জেলা পর্যায়ে কার্যকর আইসিইউ চালু করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




















